৩ বছরে ইসরায়েল ছাড়লেন প্রায় ১,৪০০ চিকিৎসক, বাড়ছে ‘ব্রেইন ড্রেইন'
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
ইসরায়েল থেকে চিকিৎসকদের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত তিন বছরে, অন্তত ১ হাজার ৩৭০ জন চিকিৎসক এক বছরের বেশি সময়ের জন্য দেশ ছেড়েছেন। এর ফলে দেশটির স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনশক্তির সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন অধ্যাপক ইতাই আতার, অধ্যাপক নিটাই বার্গম্যান ও ডোরন জামির।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল ছাড়ার প্রবণতা, আগের এক দশকের তুলনায়, উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের একই সময়ের তুলনায়, গত তিন বছরে, বিদেশে যাওয়া চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪ শতাংশ।
২০২৩ সালে, অন্তত এক বছরের জন্য ইসরায়েল ছেড়েছিলেন ৪১৬ জন চিকিৎসক। ২০২৪ সালে, এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩০ জনে। আর ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে আরও ৪১৯ জন চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন।
তবে বিদেশে যাওয়া চিকিৎসকদের কেউ কেউ পরে ইসরায়েলে ফিরে এসেছেন। তাদের হিসাব ধরার পরও শুধু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দেশটির চিকিৎসক সংকটের নিট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০৯ জনে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ২৫৫ জন চিকিৎসক কমেছে।
গবেষকদের মতে, এই হার আগের দশকের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে চিকিৎসকদের নিট বার্ষিক ঘাটতি ছিল গড়ে মাত্র ৫৪ জন।
ইসরায়েলি সরকারের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ হচ্ছে দেশটির অভিজ্ঞ চিকিৎসকরাও যাচ্ছেন বিদেশে। ইসরায়েলের প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মধ্যেই দেশ ছাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কান-নাক-গলা রোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই হার তুলনামূলক বেশি।
গবেষণায় দেখা যায়, এসব বিশেষজ্ঞের প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ এক বছরের বেশি সময়ের জন্য বিদেশে গেছেন। এছাড়া বিদেশে যাওয়া চিকিৎসকদের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ ছিলেন সার্জন, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ এবং ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ওষুধ বিশেষজ্ঞ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে গবেষকরা দেখিয়েছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশত্যাগের হারকে। ইসরায়েল ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের অন্তত ১৪ শতাংশই ছিলেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক—অর্থাৎ প্রতি সাতজনের একজন। এক দশক আগে এই হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
বিদেশে যাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ২০ শতাংশের বয়স ৪৫ বছরের বেশি। ফলে শুধু তরুণ চিকিৎসকরাই নয়, অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসকদের একটি অংশও দেশ ছাড়ছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে এক বছরের জন্য বিদেশে যাওয়া মানেই স্থায়ীভাবে ইসরায়েল ছেড়ে যাওয়া নয়। অনেক চিকিৎসক উচ্চতর প্রশিক্ষণ, গবেষণা কিংবা বিশেষায়িত পেশাগত কর্মসূচিতে অংশ নিতে সাময়িকভাবে বিদেশে যান। তাদের কেউ কেউ পরে দেশে ফিরে আসেন। আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার পর সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। গবেষকদের মতে, চিকিৎসকদের বিদেশমুখী এই প্রবণতা শুধু জনশক্তির ঘাটতিই তৈরি করছে না, ইসরায়েলের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার মানের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে এক বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশে থাকা চিকিৎসকের সংখ্যা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে দেশটির ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। কারণ অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি অংশ দেশের বাইরে চলে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের সুযোগ কমে যেতে পারে।
অধ্যাপক ইতাই আতার বলেন, '২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল তার সেরা মানুষদের হারাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক মানুষ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে প্রায় ১ হাজার ৪শ' চিকিৎসকের দেশত্যাগের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে চিকিৎসাসেবায়—বাড়তে পারে অপেক্ষার সময়, কমতে পারে চিকিৎসার কার্যকারিতা এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আতার সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামগ্রিক সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার ওপর 'অপূরণীয় ক্ষতি' হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
/এআই