ইরান যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের পকেটে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম উঠে গেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে পরিবহন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ট্রাক, ট্রেন, নৌযান ও বাসের পাশাপাশি কৃষি ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহনে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু চালকদের ওপরই নয়, পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতেও পড়তে পারে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম এখন ৫ দশমিক ৮৫ ডলার। এক বছর আগে, একই পরিমাণ ডিজেলের গড় দাম ছিল ৩ দশমিক ৭১ ডলার। এমনকি, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর যে সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল, বর্তমান দাম সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশ্ববাজারে পাইকারি তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে, জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সব আমেরিকানের জন্য ‘গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ জন্য ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি তেল চুক্তির কথা জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে, জানুয়ারিতে, ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেলটা ফোরস আটক করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদনে পরিচালিত একটি অভিযানের পর তাকে আটক করা হয়।
শনিবার ঘোষিত সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় প্রমাণিতভাবে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের সম্ভাবনা থাকা ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ প্রকল্পে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং ২০৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার একটি অভিজ্ঞ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে।
তবে চুক্তিটি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। কয়েকজন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের পথে যেসব বাধা রয়েছে, নতুন এই চুক্তি সেগুলো আদৌ কতটা দূর করতে পারবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে হরমুজ প্রণালীর সংকট। গাড়ির জ্বালানির অন্যতম প্রধান উপাদান অপরিশোধিত তেল। ইরান যুদ্ধের জবাবে কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত সরু এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। ফলে এর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে এবং তার প্রভাব পড়েছে খুচরা জ্বালানির দামেও।
জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। আগামী নভেম্বরে, দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে তেলের দাম বৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপও বাড়াতে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি অনুমোদনের হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। আর ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
তবে দেশটির সব অঞ্চলে জ্বালানির দাম একই হারে বাড়েনি। মার্কিন সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, করের পার্থক্য এবং দেশটির তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে দূরত্বের কারণে পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডিজেলের দাম তুলনামূলক বেশি।
এর মধ্যে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮১ ডলার। এক বছর আগে সেখানে এই দাম ছিল ৫ দশমিক ৩ ডলার।
শুধু ডিজেল নয়, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দামও ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম এখন ৪ দশমিক ১৫ ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ২০ ডলার।
/এআই