জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন
হরমুজের তলদেশে ইন্টারনেট ক্যাবল কাটার আহ্বান ইরানের কট্টরপন্থিদের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে দেশটির কট্টরপন্থি গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী মহল। এর অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি ও আরব উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক ইন্টারনেট ক্যাবল বিচ্ছিন্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট এ তথ্য জানায়
ইরানের অতি রক্ষণশীল সংবাদপত্র কেইহান-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে জবাব দিতে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ক্যাবলের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা বা সেগুলো কেটে দেওয়া ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ হতে পারে।
এক নিবন্ধে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘পরাজিত করতে’ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট ক্যাবল বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার ইরানের নেই কি না।
শারিয়াতমাদারির মতে, কেবলগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করা কিংবা সরাসরি কেটে দেওয়ার মাধ্যমেও এ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
তবে এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং যুদ্ধে সরাসরি জড়িত নয়—এমন আরও কিছু দেশ ইরানের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসব দেশ ‘প্রতিরোধ গড়ে না তোলায়’ তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গণমাধ্যম এর আগেও সমুদ্রতলের ক্যাবলকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে।
আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এমনকি ক্যাবল ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান যে ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল অনুসরণ করেছে, ক্যাবলগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আগস্টের মাঝামাঝি এক প্রতিবেদনে জানায়, আইআরজিসি সংঘাত আরও বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল নাশকতার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ক্যাবল আক্রান্ত হলে হুমকিতে পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীনের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এসব ক্যাবলের গুরুত্ব অনেক বেশি।
সাবেক ব্রিটিশ সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সামরিক ইতিহাসবিদ ড. লিনেট নুসবাখার দ্য জেরুজালেম পোস্ট-কে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এসব ক্যাবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, ইরানের জন্য এসব ক্যাবল এখনো বড় ধরনের চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হলেও, তেহরানকে এখন পর্যন্ত সেটি ব্যবহার করতে হয়নি। কারণ হরমুজ প্রণালিকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন তেল ও গ্যাস পাইপলাইন চালু হলে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব কমে আসবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
মার্কিন হামলা কি ক্যাবল রক্ষার আগাম পদক্ষেপ?
এদিকে সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া বুধবার এক মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যে হামলা চালিয়েছে, তা ছিল সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবলে ইরানের হামলার বিরুদ্ধে একটি আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। তবে ওই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইএসডব্লিউ বলছে, তথ্যটি সত্য হলে তা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ইঙ্গিত করতে পারে—ইরান হয়তো তার ‘চাপ প্রয়োগের কর্মকাণ্ড’ আরও বিস্তৃত করার কথা বিবেচনা করছে।
সমুদ্রতলের আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবলগুলোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে ইন্টারনেট যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোয় ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংঘাত এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
/এআই