২৮৬ দিনের অভিযানের পর মরিচায় ঢেকে গেছে মার্কিন রণতরী, বিস্মিত পর্যবেক্ষকরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
দীর্ঘ ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে থাইল্যান্ডের বন্দরে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। তবে বন্দরে ঢোকার পর জাহাজটির চেহারা দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট দীর্ঘ বিশাল এই যুদ্ধজাহাজের সামনের অংশ থেকে পেছন পর্যন্ত প্রায় সর্বত্রই দেখা গেছে মরিচার দাগ।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পর জাহাজের এমন অবস্থায় পৌঁছানো অস্বাভাবিক নয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর ঘাঁটি ছাড়ার পর থেকে প্রায় ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছে আব্রাহাম লিংকন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ ও অবরোধমূলক অভিযানেও অংশ নিয়েছে জাহাজটি।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টার, যিনি আব্রাহাম লিংকনের মতো নিমিটজ শ্রেণির বিমানবাহী রণতরীতে তিন দফা দায়িত্ব পালন করেছেন, বলেন, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে পানির সমতলের কাছে মরিচা পড়া খুবই স্বাভাবিক।
তার ভাষ্য, কোনো জাহাজ যদি টানা ৬০ দিন বা তার বেশি সময় সমুদ্রে সক্রিয় থাকে, তাহলে পানির রেখার কাছে মরিচা দেখা যেতেই পারে।
সমুদ্রে থাকাকালে মরিচা দূর করা কঠিন
শুস্টারের মতে, সমুদ্রে অবস্থান করেই জাহাজের বড় ধরনের মরিচা পরিষ্কারের কাজ করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান চলাকালে।
এ ধরনের কাজ করতে হলে নাবিকদের জাহাজের পানির সমতলের নিচের অংশে নামতে হবে। এরপর মরিচা ঘষে তুলে প্রথমে দুই স্তর মরিচা প্রতিরোধী প্রাইমার এবং পরে দুই স্তর নেভাল গ্রে রং দিতে হবে।
তার ধারণা, পুরো জাহাজের মরিচা পরিষ্কার করে সংরক্ষণমূলক কাজ শেষ করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে থাইল্যান্ডে অবস্থানের সময় গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় এ কাজ শুরু করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
কয়েক দিনের বিশ্রামে থাইল্যান্ডে নোঙর
বুধবার থাইল্যান্ডের উপসাগরীয় অঞ্চলের লায়েম চাবাং বন্দরে নোঙর করেছে আব্রাহাম লিংকন। ব্যাংককের দক্ষিণে অবস্থিত এই বন্দরে কয়েক দিন অবস্থান করার কথা রয়েছে জাহাজটির।
দীর্ঘ অভিযানের পর এটি জাহাজটির নাবিকদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম ও বিনোদনের সুযোগ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রায় এক সপ্তাহের এই বিরতিতে জাহাজটির বড় ধরনের সংস্কার করা হবে না। শুস্টারের মতে, সাত দিনের অবস্থানে কেবল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া কাজগুলোই করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, জাহাজের সামনের অংশ ও পানির রেখার কাছাকাছি থাকা অংশের মরিচা আগে পরিষ্কার করা হবে। কারণ সমুদ্রে চলার সময় এসব অংশ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে। বিশেষ করে উত্তাল পানিতে লবণাক্ত পানির ক্ষয়কারী প্রভাব এসব অংশে বেশি পড়ে।
শিপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরিচার বিষয়টি দীর্ঘদিন ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
শুস্টার মরিচাকে সংক্রামক রোগের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এক জায়গায় মরিচা ধরলে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই শুরুতেই এর মোকাবিলা করা ভালো। না হলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় ধরনের ক্ষতি সামাল দিতে হতে পারে।
মরিচা ধাতব কাঠামো দুর্বল করে দেয়। ফলে ডেক, চলাচলের পথ ও নিরাপত্তা-রেলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই মরিচা সরিয়ে ফেলা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
দীর্ঘ অভিযানে আরও নানা সমস্যার মুখে লিংকন
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় আব্রাহাম লিংকনের জন্য মরিচাই একমাত্র সমস্যা নয়। দীর্ঘ অভিযানের কারণে জাহাজটির নাবিকদের মনোবল নিয়েও নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি অন্তত একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর জাহাজটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
‘জাহাজ তৈরি করো, মরিচা ঠিক করো’
গত বছর তৎকালীন মার্কিন নৌবাহিনী সচিব জন ফেলান জানিয়েছিলেন, যুদ্ধজাহাজে মরিচা ধরার বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প তাকে মাঝরাতেও ফোন করতেন।
ফেলান বলেন, ট্রাম্প তাকে বারবার বলতেন—জাহাজ নির্মাণ বাড়াতে হবে, রক্ষণাবেক্ষণ ইয়ার্ড থেকে জাহাজগুলো দ্রুত বের করতে হবে এবং ‘মরিচা ঠিক করতে হবে’।
ফেলানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধজাহাজে মরিচা দেখা ট্রাম্প পছন্দ করেন না, আর এ নিয়ে মাঝরাতে ফোন পেতেও তার ভালো লাগত না।
তবে সাবেক নৌ-কর্মকর্তা শুস্টারের মতে, মরিচা নিয়ে কাজ করা শুধু কর্মকর্তাদের কাছেই বিরক্তিকর নয়, নাবিকদের কাছেও এটি সবচেয়ে অপছন্দের কাজগুলোর একটি।
তিনি বলেন, নৌবাহিনীতে মরিচার বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং জাহাজের প্লাম্বিং-সংক্রান্ত কাজ—এই দুটিই নাবিকদের কাছে সবচেয়ে অপছন্দের দায়িত্বগুলোর মধ্যে পড়ে। তিনি নিজেও জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে জাহাজে দায়িত্ব পালনের সময় দুটোকেই সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করতেন।
/এআই