নেপালের বন্যা
ধার করা ১৬'শ টাকায় মাইলের পর মাইল পদযাত্রা, নিখোঁজ ছেলের খোঁজে অসহায় বাবা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
নেপালের সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় নিখোঁজ হয়েছেন হাজারো মানুষ। সেই দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে এক হতভাগ্য পিতার আর্তনাদ নাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের বিবেক। চড়া সুদে ধার করা মাত্র ১৬'শ টাকা সম্বল করে পাহাড়ি কাদামাখা রাস্তায় মাইলের পর মাইল হেঁটে নিজের একমাত্র নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব পিতা তালকা সাদা।
তালকা সাদার বাড়ি নেপালের দক্ষিণ তরাই অঞ্চলের প্রান্তিক জেলা সপ্তরীতে। তিনি সেখানকার চরম সুবিধাবঞ্চিত ‘মুসাহার’ সম্প্রদায়ের মানুষ। তার একমাত্র ছেলে ১৯ বছর বয়সী বিনোদ সাদা এক মাস আগে উত্তরাঞ্চলীয় রসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। গত ২৬ আগস্ট ভোটকোশী নদীতে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল ও হরপা বানে প্রকল্পটিসহ পুরো এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এরপর থেকেই বিনোদসহ আরও চারজন তরুণ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি পিতা। প্রতি একশত টাকায় ২০ টাকা সুদের শর্তে ধার করা সামান্য টাকা পকেটে নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে রওয়ানা হন কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে। গায়ে ময়লা পলিথিনের রেইনকোট আর পিঠে পুরনো ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে কাঠমান্ডুর একের পর এক হাসপাতালের মর্গ আর ট্রমা সেন্টারে ঘুরেছেন তারা।
কিন্তু উদ্ধার হওয়া বহু মরদেহের বিকৃত অবস্থার কারণে কোনো হদিস মেলেনি বিনোদের। সেখান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের বিধ্বস্ত পাহাড়ি শহর নুয়াকোটের ত্রিশূলি পর্যন্ত হেঁটেছেন ভাঙাচোরা কর্দমাক্ত পথ ধরে।
তালকা সাদার অভিযোগ, প্রান্তিক মধেশি ও মুসাহার সম্প্রদায়ের হওয়ায় এবং সাবলীলভাবে নেপালি ভাষায় কথা বলতে না পারায় সেনা ক্যাম্প ও সরকারি দফতরগুলোতে তাদের চরম অবহেলার শিকার হতে হচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমরা গরিব বলে আমাদের মানুষ ভাবা হচ্ছে না। অন্তত ছেলের মৃতদেহ দেখার অধিকারটুকুও কি আমাদের নেই? থানায় ও ক্যাম্পে নাম লিখিয়েছি, কিন্তু কেউ আমাদের ঢুকতে দিচ্ছে না।
যদিও নেপাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, দুর্যোগের মাত্রা ভয়াবহ হওয়ায় এবং ১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকাজে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এদিকে পকেটের শেষ সম্বলটুকু ফুরিয়ে আসার উপক্রম হলেও ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছাড়তে নারাজ এই পিতা।
ক্ষোভ, হতাশা আর গভীর বেদনায় দুলতে থাকা পিতা তালকা সাদা আবারও রওয়ানা হয়েছেন পাহাড়ি প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপের দিকে একমাত্র সন্তানকে জীবিত কিংবা মৃত খুঁজে পাওয়ার শেষ আশায়।
/এএ