×
Logo

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

এসসিও সম্মেলনে শি-মোদি-পুতিন, এবারের এজেন্ডায় কী থাকছে?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

এসসিও সম্মেলনে শি-মোদি-পুতিন, এবারের এজেন্ডায় কী থাকছে?

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই মঞ্চে বসতে যাচ্ছেন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে দুই দিনের এ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চলমান বিভিন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসসিও'র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের সম্মেলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চম বছরে গড়ানো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে কতটা এগোতে পারে, সেটিই সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারা থাকছেন সম্মেলনে?

এবারের এসসিও সম্মেলন হচ্ছে বিশকেকে। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য— ‘টুগেদার ফর সাসটেইনেবল পিস, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রসপারিটি’, অর্থাৎ টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে এগিয়ে চলা।

শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের নেতারাও এতে অংশ নেবেন।

এছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আসিয়ান মহাসচিব কাও কিম হর্নেরও সম্মেলনে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, চলমান যুদ্ধগুলো আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য নিজেদের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানো এবং সম্পর্ক ও সহযোগিতা গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে এসসিও সম্মেলন।

ইয়াং বলেন, বহু বছর ধরে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তোলার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এসসিওকে দেখে আসছে চীন।

তবে তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাতের মধ্যে চীন এবারের সম্মেলনকে নিজেদের এমন একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে ব্যবহার করতে পারে, যারা সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে নিজেদের পার্থক্যও স্পষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে বেইজিং।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তব সংঘাত নিরসনের কোনো বড় প্রস্তাবে রূপ নেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন তিনি।

২৫ বছরে কতটা বদলেছে এসসিও?

১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ’ নামে এসসিওর যাত্রা শুরু। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান মিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সীমান্ত বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে এই জোট গড়ে তোলে।

২০০১ সালের জুনে, সংগঠনটির পরিধি বাড়িয়ে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও গঠন করা হয়। তখন উজবেকিস্তানও এতে যোগ দেয় এবং বেইজিংয়ে সংগঠনটির সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়।

২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। এরপর ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ পূর্ণ সদস্য হয়। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, মিশর, তুরস্ক, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়াসহ ১৪টি দেশ এসসিওর গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অংশীদার।

বর্তমানে এসসিওভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে।

এসসিও কি পশ্চিমাবিরোধী জোট?

নিরাপত্তা জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে এসসিওর কার্যক্রম বাণিজ্য, অর্থনীতি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিস্তৃত হয়েছে।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আলেহান্দ্রো রেয়েসের মতে, এসসিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এশিয়া-প্যাসিফিক জোটগুলোর একটি ‘ভারসাম্য রক্ষাকারী’ শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তবে তিনি এটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা পশ্চিমাবিরোধী জোট হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

রেয়েসের মতে, চীন-রাশিয়া-ভারতের স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাই এসসিওকে একটি সুসংহত মার্কিনবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজেদের কৌশলগতভাবে বিকল্প জোট এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তুলে ধরতে পারে।

তার ভাষ্য, এটি আমেরিকাবিরোধী জোটের চেয়ে বরং এমন দেশগুলোর মিলনস্থল, যারা মার্কিন শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের কৌশলগত পরিসর বাড়াতে চাইছে।

এবারের সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য কী?

এসসিও সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবারের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

এছাড়া এশিয়ার দুই বড় অর্থনীতি ভারত ও চীনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ২০২০ সালে, সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েন তৈরি হয়। তবে গত বছর থেকে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির চাপ নয়াদিল্লিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের দিকে আরও আগ্রহী করেছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন। ২০১৮ সালের পর প্রথমবার গত বছর এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করেন মোদি। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনাও সম্মেলনে আলোচনায় আসতে পারে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নতুন ব্যাংক

নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক একীভূতকরণ ও আর্থিক সহযোগিতার কাঠামো নিয়েও এবারের সম্মেলনে অগ্রগতি হতে পারে।

বেঙ্গালুরুভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক তাকশশীলা ইনস্টিটিউশনের জিওস্ট্র্যাটেজি কর্মসূচির প্রধান মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, গত বছর, চীনের তিয়ানজিন সম্মেলনে, এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল।

এবার কিরগিজস্তান এসসিও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এসসিও ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ও এসসিও ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি ঘটাতে চাইছে। তবে এসব বিষয়ে এবারের সম্মেলনে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি ঘোষণা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

হরমুজ সংকটে বিকল্প বাণিজ্যপথ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার ও আর্থিক খাতে।

এই পরিস্থিতিতে এসসিওর আলোচনায় নতুন বাণিজ্য ও পরিবহন করিডোর বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ৭ হাজার ২শ' কিলোমিটার দীর্ঘ ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (আইএনএসটিসি)। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই পর্যন্ত এই করিডোর ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।

মোদি ও পুতিনের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে চলা নর্দার্ন সি রুট নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

তবে, হরমুজ প্রণালির অবরোধ এবং লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার কারণে বিশ্ববাণিজ্যে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে গত মাসে আর্কটিক মহাসাগর দিয়ে নতুন একটি নৌপথের কথা জানিয়েছে চীন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকটের কারণে প্রচলিত বাণিজ্যপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারত নর্দার্ন সি রুট ব্যবহারের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

এছাড়া ইউরেশিয়াজুড়ে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন সহজ করতে ‘সিল্ক রোড স্টেশন’-এর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগও নিতে পারে এসসিও।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কি ঐকমত্য হবে?

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবসময় ঐকমত্য দেখা যায় না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট। রাশিয়া এসসিও'র অধিকাংশ সদস্যকে নিজেদের অবস্থানের কাছাকাছি রাখতে সক্ষম হলেও ভারত তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লি একদিকে শান্তির আহ্বান জানিয়েছে এবং ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে, অন্যদিকে রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল কিনেছে।

এবারের সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও পুতিনের মধ্যে আলাদা বৈঠক হতে পারে। ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, এসসিও সম্মেলনের সাইডলাইনে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, বৈঠকে কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি এবং সামগ্রিকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হবে।

ইরান ইস্যুতে চীন-রাশিয়ার অবস্থান

তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে এসসিও তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। গত মার্চে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের নিন্দা জানায় এসসিও। সংগঠনটি বলেছে, শক্তি প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয় এবং বিদ্যমান বিরোধগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির আলোকে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করতে হবে।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভারত, ২০২৫ সালের জুনে, ইরানে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে এসসিও'র একটি যৌথ বিবৃতিতে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

এবার ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পুতিনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এ তথ্য জানিয়েছে।

রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে, চীন ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক লাইফলাইন হয়ে উঠেছে। দেশটি ইরানের অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনছে। জাতিসংঘেও মস্কো ও বেইজিং বিভিন্ন সময়ে তেহরানের পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে।

ভারত-পাকিস্তান বিরোধও হতে পারে আলোচনায়

এসসিওর ভেতরে ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটির কাছে ‘সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ’-এর নিন্দা জানানোর দাবি করে আসছে। এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে। অন্যদিকে, পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।

২০২৫ সালের এপ্রিলে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর গত জুলাইয়ে ভারত এসসিওর কাছে ওই হামলার নিন্দা জানানোর দাবি করেছিল। পাকিস্তানও নিজেদের ভূখণ্ডে সশস্ত্র হামলার জন্য ভারতকে দায়ী করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ কী?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা পররাষ্ট্রনীতি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে এবং ব্রিকসের মতো বৈশ্বিক দক্ষিণের জোটগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি করেছে। ট্রাম্প ব্রিকসকে সরাসরি ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসসিও সম্মেলনকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোটা বোঝা যাবে না।

কেওয়ালরামানি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের কিছু নীতিও অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ—কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বাড়ছে।

বাইডেন প্রশাসন ২০২৩ সালে এই পাঁচ দেশের সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা চালু করেছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে, ট্রাম্পও ওয়াশিংটনে এসব দেশের নেতাদের আতিথ্য দেন।

যুক্তরাষ্ট্র মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়েও কাজ করছে। একই সঙ্গে কাজাখস্তান আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে—মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে।

অর্থাৎ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও চীন ও রাশিয়ার প্রভাবের মধ্যে নিজেদের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বহুমুখী সম্পর্কের পথে হাঁটছে।

কেওয়ালরামানির মতে, বিকল্প আর্থিক ও জ্বালানি কাঠামো নিয়ে এসব দেশের মধ্যে আরও সক্রিয় আলোচনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিক্ষিপ্ত ও অস্থির’ পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরছে।

বিশ্লেষক আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরোর মতে, ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াডে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনছে; অন্যদিকে চীন-প্রধান এসসিওতে থেকে মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০০৭ সালে চীনের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে কোয়াড গঠন করে। গত ২৫ বছরে বেইজিংয়ের উত্থান নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগের কারণে নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

তবে রেয়েসের মতে, ওয়াশিংটনের উচিত এসসিওকে একটি সমন্বিত যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে না দেখা।

তার মতে, চীন, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে স্বার্থগত পার্থক্য এতটাই বড় যে এসসিওকে সরাসরি মার্কিনবিরোধী জোট বলা যায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ এমন দেশগুলোকেও কাছাকাছি আনতে পারে, যাদের মধ্যে অন্যথায় যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।

তার ভাষায়, একতরফা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এসসিও'র অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও রাশিয়া স্পষ্টভাবেই এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কম থাকবে। ভারত হয়তো ঠিক একই লক্ষ্য অনুসরণ করছে না; তবে নয়াদিল্লিও এমন একটি বিশ্ব চায়, যেখানে ওয়াশিংটন তার পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নির্ধারণ করতে না পারে।

ফলে বিশকেকের এবারের এসসিও সম্মেলন কেবল তিন পরাশক্তি—চীন, রাশিয়া ও ভারতের বৈঠক নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো কীভাবে নিজেদের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

/এআই 

Logo