×
Logo

আন্তর্জাতিক

রুশ হামলায় ধ্বংস ১ কোটি ২০ লাখ বই, যুদ্ধের মধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতি ইউক্রেনে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২ পিএম

রুশ হামলায় ধ্বংস ১ কোটি ২০ লাখ বই, যুদ্ধের মধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতি ইউক্রেনে

ইউক্রেনে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে দেশটির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলের পাঠ্যবইও। কিয়েভে একটি ছাপাখানায় হামলার পর নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য বই ছাপার কাজও থমকে গেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ছাপাখানাটির ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কনভি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পরিচালক ভিক্টোরিয়া হাইদাই দেখছিলেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মুদ্রণযন্ত্রের অবশেষ। অথচ এই সময় ব্যস্ত থাকার কথা ছিল পুরো কারখানাটির। নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে সেখানে ছাপা হচ্ছিল লাখ লাখ পাঠ্যবই।

কিয়েভে অবস্থিত ওই ছাপাখানায় রাতের আঁধারে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার সময় নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য ১৩ লাখ বই ছাপার প্রস্তুতি চলছিল। এসব বই ইউক্রেনের মোট স্কুলপাঠ্যবইয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

হামলার পর পুড়ে যাওয়া ছাপাখানার ছাইয়ের মধ্যে পাওয়া গেছে ইংরেজি ভাষার একটি পাঠ্যবইয়ের পোড়া পৃষ্ঠা। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমার নাম উইলিয়াম, আমি যুক্তরাজ্য থেকে এসেছি। আমার দাদি নটিংহামে থাকেন। এটি একটি সুন্দর শহর।’

বই ছাপার প্রতিষ্ঠানও রুশ হামলার লক্ষ্য

সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনজুড়ে একের পর এক ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দেশটি। এসব হামলায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউক্রেনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইউক্রেনে যত বই ছাপা হয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই রুশ হামলায় ধ্বংস হয়েছে।

কিয়েভের ওই ছাপাখানা থেকে কোনো বই আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আগুনের হাত থেকে কোনো কোনো পৃষ্ঠা বেঁচে গেলেও সেগুলোও পানি পড়ে নষ্ট হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের সময় ব্যবহৃত পানি কিংবা ছাদ ধসে পড়ার পর বৃষ্টির পানিতে ভিজে এসব বই ও কাগজের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।

কনভি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পরিচালক ভিক্টোরিয়া হাইদাই বলেন, এসব হামলা পরিকল্পিত বলেই তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, রুশ ফেডারেশন ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব করছে। গত দুই মাসে বেশ কয়েকটি বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের লজিস্টিকস গুদাম হারিয়েছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ বই সংরক্ষণ করা হয়েছিল।’

হাইদাই আরও বলেন, ‘ইউক্রেনকে একটি জাতি হিসেবে মুছে ফেলার চেষ্টা হিসেবেই রাশিয়া ছাপাখানাগুলো ধ্বংস করছে। তবে সত্যি বলতে, তারা এতে সফল হবে না।’

গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের ৩৫টিরও বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে বলে তিনি জানান।

পুড়ে গেছে পুরোনো বইয়ের বাজারও

শুধু নতুন বই নয়, পুরোনো ও দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহও রুশ হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। কিয়েভের পোচাইনা পুরোনো বইয়ের বাজারেও হামলা হয়েছে। এতে শত শত ব্যক্তিগত দোকান ও অসংখ্য মূল্যবান বই পুড়ে গেছে।

অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আগুন পুরোপুরি নেভানোর আগেই সেখানে পৌঁছে যান ২৮ বছর বয়সী বই-বিষয়ক ব্লগার লিলিয়া ভেলিকা। জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তিনি খুঁজছিলেন এমন কিছু, যা হয়তো উদ্ধার করা সম্ভব।

একপর্যায়ে তার হাতে উঠে আসে পানিতে ভেজা একটি সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস।

লিলিয়া বলেন, ‘বই আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। এগুলো হারানো মানে যেন আমাদের হৃদয় হারানো।’

হামলার শিকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও

ইউক্রেনে রুশ হামলায় শুধু বই, ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। জাদুঘর, চিত্রশালা, চলচ্চিত্র স্টুডিও, গ্রন্থাগার এবং অপেরা হাউসও হামলার শিকার হয়েছে।

কিয়েভ-পেচের্স্ক লাভরাতেও আঘাত হেনেছে হামলা। রাজধানী কিয়েভের এই বিশাল মধ্যযুগীয় মঠটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সেখানে অবস্থিত ডরমিশন ক্যাথেড্রালের সোনালি গম্বুজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হামলার আগে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে ড্রোন হামলার পর ক্যাথেড্রালের ছাদের বড় একটি অংশে আগুন ধরে যায়।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, ভবনটি মেরামতে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলার খরচ হবে এবং কাজ শেষ করতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর।

এই কমপ্লেক্সেই রয়েছে ইউক্রেনের বই ও মুদ্রণবিষয়ক জাদুঘর। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় কিয়েভ-পেচের্স্ক লাভরা। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় যুক্ত করা হয়।

সম্প্রতি মঠটি প্রতিষ্ঠার ৯৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালেদ এল-এনানি এই স্থাপনায় ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি’ দেখে গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।

সেখানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর সব ধরনের হামলার নিন্দা জানায় ইউনেস্কো।

পরে ইউক্রেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী তেতিয়ানা বেরেজনার সঙ্গে ক্যাথেড্রালটি পরিদর্শন করেন এল-এনানি। বেরেজনা বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধের সামরিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

‘ইউক্রেনকে জাতি হিসেবে মুছে ফেলতে চায় রাশিয়া’

বেরেজনার ভাষায়, ‘এটি অস্তিত্বের লড়াই। তাই রাশিয়া একটি জাতি হিসেবে আমাদের ধ্বংস করতে চায়, আমাদের মুছে ফেলতে চায়—যেন ইউক্রেনীয়রা কখনো ছিল না, কখনো তাদের অস্তিত্বই ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণেই রাশিয়া আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এখানে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের উপস্থিতির প্রতীকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।’

বেরেজনার দাবি, ইউক্রেনীয়দের পরিচয় ও সংস্কৃতি তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই এসব স্থাপনা ও নিদর্শন রুশ হামলার লক্ষ্য হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের পরিচয় রক্ষা করছি, আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করছি। আর রাশিয়া এমন সবকিছু ধ্বংস করতে চায়, যা তারা নিজেদের করে নিতে পারে না।’

বেরেজনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এ পর্যন্ত ইউক্রেনের ১ হাজার ৯০০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং ২ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে।

ডিজিটাল সংরক্ষণে জোর

যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় ডিজিটাল সংরক্ষণ বা ডিজিটাইজেশনকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বই, শিল্পকর্ম ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সম্পদের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে মূল নিদর্শন ধ্বংস হয়ে গেলেও সেগুলোর তথ্য ও ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।

তবে দেশটির পুরো প্রকাশনা খাতই এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই খাতকে সচল রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

কিয়েভের ক্ষতিগ্রস্ত ছাপাখানায় দাঁড়িয়ে ভিক্টোরিয়া হাইদাই বলেন, ইউক্রেনীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তার কথায়, ‘শব্দই সবকিছু। এটি আমাদের উন্নয়ন, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য—যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যায়।’

ইউক্রেনের অস্তিত্ব নিয়ে পুতিনের বক্তব্য

ইউক্রেনের সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে—এমন অভিযোগের পেছনে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুরোনো বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।

২০২১ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘অন দ্য হিস্টোরিক্যাল ইউনিটি অব রাশিয়ানস অ্যান্ড ইউক্রেনিয়ানস’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি রুশ ও ইউক্রেনীয়দের একই জাতি বা জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে স্বাধীন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র ও স্বতন্ত্র ইউক্রেনীয় সংস্কৃতির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রাশিয়ার পাল্টা দাবি

তবে ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ দূতাবাস।

বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দূতাবাসটি ইউক্রেনের নিজস্ব সরকারকেই দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতির জন্য দায়ী করেছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন স্থাপনা বা স্মৃতিস্তম্ভ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং রাস্তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

রুশ দূতাবাস আরও দাবি করেছে, ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো সামরিক স্থাপনা আড়াল করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর গত পাঁচ বছর ধরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইচ্ছাকৃত হামলা চালানোর অভিযোগও বারবার অস্বীকার করে আসছে ক্রেমলিন। তবে এই সময়ের মধ্যে আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোয় বারবার ও ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।

/এআই 

Logo