×
Logo

আন্তর্জাতিক

তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে পারে মিশর: এরদোয়ান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম

তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে পারে মিশর: এরদোয়ান

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পরবর্তী দেশ হিসেবে মিশর যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জোটের সদস্যপদ সম্প্রসারণের সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে কায়রোর যোগদানের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত চুক্তিটি, গত শুক্রবার (৭ আগস্ট), সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষর করেন এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।

চুক্তির আওতায়, যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ কোনো দেশ বাইরের কোনো হুমকির মুখে পড়লে অন্য দুই দেশ সমন্বিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

এরদোয়ান বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সম্মিলিত প্রতিরক্ষার এই ধারা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করা হলেও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এটিকে পশ্চিমা সামরিক জোটের আঞ্চলিক সংস্করণ হিসেবে অভিহিত 'না' করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। 

এমনকি, ইসলামাবাদও জানিয়েছে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি।

এরদোয়ান বলেন, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির জন্য চুক্তিটি উন্মুক্ত রয়েছে এবং মিশরের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে, চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারের চেষ্টা করছে, তখন তুর্কি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য সামনে এলো।

সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার সংঘাত নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করাকে তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ তৈরি করেছে এই জলপথ।

আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে কাতারের ভূমিকারও প্রশংসা করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, সংঘাত কমানো এবং চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় দোহা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

সিরিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় তুরস্ক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। আঞ্চলিক অস্থিরতার এই সময়ে প্রতিবেশীদের পাশে থাকা থেকে আঙ্কারা সরে আসবে না।

সিরিয়া সফরের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে দেশটির কুর্দি জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। অঞ্চলজুড়ে কুর্দি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার এবং তাদের অধিকার সমর্থনে তুরস্ক কাজ করে যাবে বলেও জানান তিনি।

গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, ফিলিস্তিনিদের একা ছেড়ে দিতে পারে না তুরস্ক। রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “তুরস্ক গাজাকে একা ছেড়ে দিতে পারে না।”

হামাস আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে বলেও মন্তব্য করেন এরদোয়ান। অন্যদিকে, ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। এ নিয়ে সম্প্রতি তুরস্ক সফর করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এরদোয়ানের মতে, সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় সমর্থন দিতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সুদান ও লিবিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। সুদানের প্রতি তুরস্কের সমর্থন অব্যাহত থাকবে জানিয়ে দেশটির সার্বভৌম কাউন্সিলের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

লিবিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, আঙ্কারা ও ত্রিপোলির সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে। লিবিয়াকে তুরস্ক কখনো একা ছেড়ে যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের বিষয়েও তুরস্কের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন এরদোয়ান।

তিনি বলেন, ইইউ'র সদস্য হওয়া এখন আর আঙ্কারার বড় অগ্রাধিকার নয়। একইসঙ্গে, তুরস্ককে সদস্য করতে ইউরোপীয় নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এরদোয়ানের দাবি, সদস্যপদ পাওয়ার আলোচনা দীর্ঘদিন আটকে থাকলে তুরস্কের চেয়ে ইউরোপই শেষ পর্যন্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

১৯৯৯ সাল থেকে ইইউ'র প্রার্থী দেশ হিসেবে স্বীকৃত তুরস্ক। তবে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, আঞ্চলিক বিরোধ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে বহু বছর ধরে দেশটির সদস্যপদ আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন 'এফ-৩৫' যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় যুক্ত হওয়ার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান।

তিনি জানান, ট্রাম্প 'এফ-৩৫' যুদ্ধবিমান নিয়ে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মার্কিন প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে তুরস্ক।

রাশিয়ার তৈরি 'এস-৪০০' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর, ২০১৯ সালে, তুরস্ককে 'এফ-৩৫' কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, রাশিয়া, 'এফ-৩৫'-এর গোপন প্রযুক্তি ও সক্ষমতা সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং পুরো কর্মসূচির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট’-এর আওতায় তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

গত মাসে, আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, তার প্রশাসন তুরস্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে এবং দেশটিকে 'এফ-৩৫' কর্মসূচিতে ফেরার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।

তবে এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে ওয়াশিংটন। ২০২০ সালে, পাস হওয়া একটি আইনে তুরস্কের কাছে 'এফ-৩৫' হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যতদিন পর্যন্ত আঙ্কারা রুশ 'এস-৪০০' ব্যবস্থা নিজেদের কাছে রাখবে। তবে, তুরস্ক জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার 'এস-৪০০' বিক্রি করার কথা ভাবছে এবং ইতোমধ্যে বিষয়টি মস্কোকে জানানো হয়েছে। 

সমর বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিশর যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি প্রভাবশালী সামরিক শক্তি একই প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় আসবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে নিরাপত্তা সহযোগিতার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

/এআই 

Logo