ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক এড়াতে চীনকে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ: হোয়াইট হাউস
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
চীনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় মার্কিন শুল্ক এড়াতে ৪০টির বেশি দেশ সহায়তা করেছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) প্রকাশিত ব্রিটিশ মিডিয়া বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা পণ্য এমন সব দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে, যেসব দেশের ওপর তুলনামূলক কম আমদানি শুল্ক রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪০টির বেশি দেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে চীন কয়েক হাজার কোটি ডলারের মার্কিন শুল্ক এড়িয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
হোয়াইট হাউসের বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে ‘মার্কিন কর্মসংস্থান ও রাজস্বে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।’
তবে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না।’
একইসঙ্গে, তিনি মার্কিন শুল্কনীতি এবং চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের বিরোধিতা করেন।
চীনা দূতাবাসের ওই মুখপাত্র আরও বলেন, তৃতীয় কোনো দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়, এমন একতরফা পদক্ষেপ বা ট্রান্সশিপমেন্ট-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
কীভাবে শুল্ক এড়ানো হয়েছে?
হোয়াইট হাউসের বরাতে বিবিসি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ শুল্কের আওতায় থাকা দেশ থেকে পণ্য সরিয়ে তুলনামূলক কম শুল্কের দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন হিসাবের বরাত দিয়ে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এভাবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন থেকে ৩শ' বিলিয়ন ডলারের পণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরানো হয়েছে।
এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’। অর্থাৎ, পণ্য তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে অন্য একটি দেশের মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কম আমদানি শুল্কের দেশগুলোকে ব্যবহার করে চীন এই প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রকৃত উৎপাদনস্থল বা পণ্যের উৎস গোপন করতে চীন তৃতীয় কোনো দেশকে সাময়িক গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের প্যাকেজও পরিবর্তন করেছে। প্রতিবেদনে এ প্রক্রিয়াকে ‘কাগজপত্রের আড়ালে জালিয়াতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস আরও দাবি করেছে, ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। আগামী মাসে, ওয়াশিংটনে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের আগে বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক চ্যাং পাও লি বলেন, এই প্রতিবেদন চীনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হতে পারে।
তার মতে, ওয়াশিংটন যুক্তি দেখাতে পারে যে, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে চীন এখনও মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ ধরে রেখেছে। ফলে বৃহত্তর কোনো বাণিজ্য চুক্তি করতে হলে শুধু চীনের সরাসরি রফতানি নয়, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় আনতে হবে।
তবে চ্যাং বলেন, বাণিজ্য প্রবাহের কিছু পরিবর্তন বৈধ উৎপাদন স্থানান্তর এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্গঠনের কারণেও হতে পারে। কিন্তু চীনের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যেসব দেশের অর্থনীতি বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তারা এখন বাড়তি ঝুঁকি ও ব্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা
২০২৫ সালের মে মাসে, আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অধিকাংশ শুল্ক আরোপ সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হিউম্যানয়েড রোবটের ওপর বিধিনিষেধ এবং ড্রোন রফতানিতে চীনের নতুন নিয়ন্ত্রণও রয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপ করেন। তার দীর্ঘদিনের অবস্থান ছিল, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
পরবর্তীতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে রায় দিলেও ট্রাম্প বিকল্প আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন করে শুল্ক আরোপের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। এ নীতিই তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
/এআই