তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কী আছে?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যেই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান। সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে এগিয়ে থাকা এই তিন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের এ চুক্তি এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বিশ্ব রাজনীতিতে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের মক্কায় চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামের এই চুক্তির মূল কথা হলো— তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকা অবস্থায় এই চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। যে সময় ইরান ও ইরান ও তাদের মিত্র হুথিদের হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবও বাড়তি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
কেন এখন এই চুক্তি?
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলা এবং এরপর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সেই আলোচনা আরও গতি পায়।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ রিয়াদে অনুষ্ঠিত একটি ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে তিন দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়।
তবে, এখন তিন দেশই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ব্যবস্থার বাইরে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাও একে অপরের পরিপূরক। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক এবং বিপুল আর্থিক সক্ষমতার অধিকারী। আর পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। বরং তিন দেশের মধ্যে সামরিক, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের একটি কাঠামো।
ইরান ও ইসরায়েলের জন্য কী বার্তা?
চুক্তি নিয়ে এখনও ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে ইরানের এমপি ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সৌদিদের অবশ্যই জানতে হবে যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কাগজ-কলমের চুক্তি তাদের নিরাপত্তা এনে দেবে না। ঠিক যেমন বছরের পর বছর ধরে আমেরিকানদের ওপর একতরফা নির্ভরতা তাদের নিরাপত্তা এনে দেয়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। প্রয়োজনে অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও এর দরজা খোলা থাকবে।
তবে তিন দেশই সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিশেষ করে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই তুরস্ক ও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে সংঘাত কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথের ওপর জোর দিয়ে আসছে।
নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত দিতে পারে। এই উদ্যোগে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত সক্ষমতাকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক প্রভাব— সব মিলিয়ে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের এই জোট আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
/এনএ