রয়টার্সের প্রতিবেদন
ট্রাম্পের ৪শ’ মিলিয়ন ডলারের হোয়াইট হাউস বলরুম নির্মাণে আদালতের স্থগিতাদেশ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ৪শ' মিলিয়ন ডলারের হোয়াইট হাউস বলরুম নির্মাণ প্রকল্পে বড় ধাক্কা দিয়েছে দেশটির একটি ফেডারেল আপিল আদালত। শুক্রবার (৭ আগস্ট) আদালত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের ভেঙে ফেলা ইস্ট উইংয়ের জায়গায় এই বিশাল বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে আদালত বলেছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া একজন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার মৌলিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইউএস কোর্ট অব অ্যাপিলস ফর দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিটের তিন বিচারকের বেঞ্চ ২-১ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে এই সিদ্ধান্ত দেয়।
রায়ে আদালত বলেছে, ‘প্রতিটি প্রেসিডেন্টই হোয়াইট হাউসের সাময়িক বাসিন্দা, মালিক নন।’ ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের ইচ্ছামতো ভবনটির মৌলিক পরিবর্তন করার এখতিয়ার নেই।
ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশন নামের একটি সংরক্ষণবাদী সংগঠনের করা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া নির্মাণ স্থগিতাদেশও বহাল রেখেছেন আপিল আদালত।
সংগঠনটি, গত বছর, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন 'না' নিয়েই প্রশাসন হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে ফেলে এবং সেখানে প্রায় ৯০ হাজার বর্গফুটের একটি বলরুম নির্মাণ শুরু করে।
আপিল আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরা বলেন, হোয়াইট হাউসে বিশাল একটি বলরুম নির্মাণ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কংগ্রেসের। নির্বাহী বিভাগের একতরফা সিদ্ধান্তে এর অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।
রায়ে আরও বলা হয়, কংগ্রেস কখনোই নির্বাহী বিভাগকে এমন সীমাহীন ক্ষমতা দেয়নি, যার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্ট নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ‘পিপলস হাউস’ হিসেবে পরিচিত হোয়াইট হাউসের নকশা, কাঠামো ও আকৃতি আমূল বদলে ফেলতে পারেন।
তবে রায়টি কার্যকর হওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসনকে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ দিতে ১৪ দিনের জন্য তা স্থগিত রেখেছে আপিল আদালত।
হোয়াইট হাউস ও মার্কিন বিচার বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে আদালতের রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
অবশ্য, ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশনের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ট লেগস এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো, বিশেষকরে, হোয়াইট হাউস নিয়ে মানুষের মতামত জানানোর অধিকারের জন্য একটি ‘দারুণ দিন’।
এর আগে, এই প্রকল্প নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা মামলায় দুইবার নির্মাণকাজ বন্ধ করেছিলেন জেলা আদালতের বিচারক রিচার্ড লিওন। তবে তিনি ভূগর্ভস্থ নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে নিয়োগ পাওয়া লিওনের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে ট্রাম্প প্রশাসন। পরে মামলাটি আপিল আদালতে যায়।
তবে, বলরুম নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছিলো। গত ৫ জুন, আপিল আদালতে শুনানির সময় মার্কিন বিচার বিভাগের আইনজীবী ইয়াকভ রথ বলেন, ব্যক্তিগত অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
তিনি আরও দাবি করেন, হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক কাঠামো সংরক্ষণের সংগঠনটির ‘স্থাপত্যগত পছন্দ’ জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
রথের দাবি, পুরোনো ইস্ট উইংয়ের কাঠামোর কারণে প্রেসিডেন্টসহ হোয়াইট হাউসে অবস্থানকারীরা সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে ছিলেন। সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতেই নতুন বলরুম নির্মাণ প্রয়োজন।
তবে ন্যাশনাল ট্রাস্টের আইনজীবী থাডিয়াস হিউয়ার পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, প্রশাসন আসলে কংগ্রেসের কাছে যেতে চায় না।
আপিল আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক প্যাট্রিসিয়া মিলেট ও ব্র্যাড গার্সিয়া অবশ্য বলেছেন, তাদের আদেশের অর্থ এই নয় যে হোয়াইট হাউসে কখনো বলরুম নির্মাণ করা যাবে না।
তারা শুধু মামলাটি চলাকালীন এবং কংগ্রেসের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির ওপরিভাগের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
রায়ে বিচারকরা বলেন, নির্বাহী বিভাগ আইনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করবে এবং আদালত সেটি থামাতে পারবে না, এমন দাবি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে আইন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তারা। তবে বেঞ্চের একমাত্র ভিন্নমত পোষণকারী বিচারক ছিলেন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া নাওমি রাও।
তার মতে, বলরুম নির্মাণ বন্ধে নিম্ন আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা ফেডারেল আদালতের এখতিয়ারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল।
রাও লিখেছেন, নিম্ন আদালত হোয়াইট হাউসের নির্মাণকাজের ওপর সরাসরি নজরদারির ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে এবং আপিল আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরাও সেই ‘বিচারিক বাড়াবাড়ি’ বহাল রেখেছেন।
হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের ওয়াশিংটনের সরকারি ভবন ও জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের চেহারা বদলে দেওয়ার কয়েকটি উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, বড় ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন এবং হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন বলরুম প্রয়োজন। তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় এর খরচ ইতোমধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গত মে মাসে, ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ব্যয় বাড়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, নতুন বলরুমটি প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বড় এবং এর নির্মাণমানও অনেক উন্নত হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ভবনটি ‘দৃষ্টিনন্দন, নিরাপদ ও সুরক্ষিত’ হবে।
এদিকে, হোয়াইট হাউসের চেহারা বদল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলাও চলছে। পৃথক এক মামলায় সম্প্রতি এক বিচারক বলেছেন, কেনেডি সেন্টারের বাইরের অংশে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করা আইনসম্মত হয়নি। আদালত সেখান থেকে তার নাম সরিয়ে ফেলার নির্দেশও দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ের জায়গায় ৪শ' মিলিয়ন ডলারের বলরুম নির্মাণের উদ্যোগটি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ নিয়ে বড় ধরনের সাংবিধানিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
/এআই