সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের মক্কায় র আল-সাফা প্রাসাদে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় বলে এক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে সৌদি পৌঁছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাত করেন। প্রায় এক বছরব্যাপী আলোচনার পর চুক্তিটি হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুই দেশও তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করতেও চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে চুক্তিতে তিনটি দেশ ঠিক কী ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতি বা দায়িত্ব নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তুরস্কের এক কর্মকর্তার বরাতে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তিতে 'কালেক্টিভ ডিফেন্স ক্লাস' রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, 'কালেক্টিভ ডিফেন্স ক্লাস' কি? সহজভাবে বললে, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক চুক্তির এমন একটি নীতি, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ মানেই 'সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ'।
তবে, এটি পুরোপুরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে বর্তায় না। কোন শত্রু রাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তাহলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষায় সহায়তা করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত থাকবে। একইসঙ্গে, আগে থেকে থাকা কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিকে এটি বাতিল বা প্রতিস্থাপন কোনভাবেই করবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক: তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র। তবে, ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত এবং ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি হয়েছে। একমাত্র সৌদি আরবই হামলার শিকার হয়েছে এবং মিত্র যুক্তরাষ্ট্র দর্শকের মতো দেখা ছাড়া আর কিছুই করেনি মনে মন্তব্য করেছেন সমর বিশ্লেষকরা। তাই, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে অনেকটা নির্ভরতা কমিয়ে আনতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি বলেও ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যৌথভাবে, ইরানে হামলা চালানোর পর সংঘাত আরও বড় আকার নেয়। এরপর ইরান ও তার মিত্ররা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানোর পাশাপাশি তাদের জ্বালানি পরিবহনেও বাধা দিচ্ছে। এক কথায়, জ্বালানি নিয়ে ইরান শুধু একলা বোঝা বইছে না, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকেও নেতিবাচক পরিণতি ভোগ করাতে বাধ্য করছে।
এমন পরিস্থিতিতে, সংঘাতের প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও। একদিকেম হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিলেই ইরানের বিধ্বংসী খাইবার শেকান কিংবা সিজ্জিনের মতো দূরপাল্লার মিসাইলের টার্গেটে পরিণত হতে হচ্ছে।
যুদ্ধের আগে, বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ দিয়ে পরিবহন করা হতো। আর বর্তমানে দিনে কিংবা পুরো সপ্তাহজুড়ে ৮ থেকে ১০টি জাহাজও হরমুজ নিরাপদে পার করতে পারছে না।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের সংঘাত দেশটির তেল রফতানি ও উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। একইসঙ্গে, সৌদি নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভূমিকা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে।
সৌদি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জানান, ইরানের তত্ত্বাবধানে, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুতিদের কাছ থেকে সমন্বিত হামলার আশঙ্কা করছে রিয়াদ। ফলে নতুন মিত্রতা গড়ে তোলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, তিন দেশের এই বৈঠক ও চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে যখন অনিশ্চয়তা তীব্র আকার ধারণ করেছে, তখন মুসলিম বিশ্বের তিন প্রভাবশালী দেশের একসঙ্গে বসা, আঞ্চলিক ও মধ্যম শক্তিগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাগের বলেন, এই কাঠামো যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং বাস্তব সহযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে, তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। পাশাপাশি, এতে আঞ্চলিক দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার পথও তৈরি হতে পারে।
তিন দেশের সামরিক বিশ্লেষকরাও চুক্তিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রফতানিকারক। আর পাকিস্তানই বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ।
মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিটি তিন দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। পরে তারা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় তিন বছর ধরে সংঘাত চলছে। এ সময়ে অঞ্চলটির প্রায় প্রতিটি দেশই সীমান্তপারের হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র অথবা ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে।
ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ চালানোর পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়ায় ভূখণ্ড দখল করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে দুবার বিমান অভিযানও চালিয়েছে।
অন্যদিকে তেহরান সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও ইসরায়েলে মার্কিন ঘাঁটি এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তবর্তী দেশ হলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সরাসরি হামলা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পেরেছে। তবে চলমান সংঘাত তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও হুমকি তৈরি করায় উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী দুই দেশই।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই সহযোগিতায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে, সৌদি আরব প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে, এই চুক্তিতে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি। কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত ভারতের কাছ থেকে আসা হুমকিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা কয়েক দশকের পুরোনো। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেও সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। দুই দেশ যুদ্ধজাহাজ ও প্রশিক্ষণ বিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে সহযোগিতা করেছে। ২০২৩ সালে, সৌদি আরব তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার বিষয়ে চুক্তি করে, যেটিকে আঙ্কারা সে সময় নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রফতানি চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এরপর উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় ইসলামাবাদ। জুলাইয়ে কুয়েতের সঙ্গে বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করে পাকিস্তান। এর বিনিময়ে জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যতই দীর্ঘ হচ্ছে, ততই আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই চুক্তি গত বছরের সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিরই সম্পূরক। তবে এবার তুরস্কের যোগদানের মধ্য দিয়ে তিন দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
/এসআর