×
Logo

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের ৮০ % ইন্টারসেপ্টর প্রায় শেষ: সিএনএন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

যুদ্ধে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের ৮০ % ইন্টারসেপ্টর প্রায় শেষ: সিএনএন

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডার ‘বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে’ বলে সতর্ক করছেন দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর মজুত সবচেয়ে বেশি কমেছে। দুটি সূত্রের সর্বশেষ ইনভেন্টরি প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগ কমে গেছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা হয়েছে।

থাডের মজুত এতটা কমে যাওয়ার তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে আধুনিক দুটি সংস্করণ মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টি এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ৪৫২টি।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে তেহরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে এসব দেশের সক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা তাদেরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষকরে, যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও বাড়ালে প্রতিক্রিয়ায় এসব দেশকে লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সময় মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের এই সংকট আবারও সামনে আসে। গত কয়েক সপ্তাহে, অন্তত দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্পের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টারা গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এদিকে, পেন্টাগনের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের অত্যন্ত নির্ভুল দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্রের ‘প্রায় সবই’ ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে নির্দিষ্ট উদ্বেগের কথা প্রথম জানিয়েছিল রয়টার্স।

অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার সতর্কবার্তার পাশাপাশি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষকরে, জ্বালানি খাত লক্ষ্য করে হামলা চালালে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কী হতে পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্পকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগও সামনে আসে।

সূত্রগুলোর দাবি, সবকিছু মিলিয়ে ট্রাম্পের কট্টরপন্থী কিছু উপদেষ্টাও শেষ পর্যন্ত সপ্তাহান্তে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করার পক্ষে যুক্তি দেখানোর কারণ পান।

একজন জ্যেষ্ঠ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার ইরানে বড় ধরনের হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই দিনই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চূড়ান্তভাবে হামলার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল।

তবে শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর অবস্থান পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। এসব দেশের নেতারা তাকে জানান, তারা ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তারা।

তাদের উদ্বেগ শোনার পাশাপাশি ইরানের বক্তব্যও বিবেচনায় নেন ট্রাম্প। এরপর আপাতত হামলার প্রস্তুতি থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন হেগসেথকে। তবে ভবিষ্যতে হামলার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্ট যখন, যেখানে প্রয়োজন মনে করবেন, তখন অভিযান পরিচালনার জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কমান্ড এলাকায় একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করেছি। একই সঙ্গে মার্কিন জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ সামরিক সক্ষমতাও আমাদের হাতে রয়েছে।’

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলিও সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে ‘পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি’ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে কী পরিণতি হতে পারে। তারপরও প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্র উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ এগুলো বিশ্বের সেরা অস্ত্র।’

তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে এরইমধ্যে উঠেছে প্রশ্ন। সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত মাসের শেষ দিকে, হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত আরেক বৈঠকেও মার্কিন অস্ত্রের মজুতের বিষয়টি তুলেছিলেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। ওই বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত আরও বাড়ানোর সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।

ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির আশঙ্কার বিষয়টিও সেখানে তোলা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আলোচনার বিষয়ে অবগত আরেক ব্যক্তি।

তবে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত নিয়ে ধারাবাহিকভাবে যে উদ্বেগের কথা উঠে আসছে, তাতে পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্ত্র সংকট ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী একটি সূত্র বলেন, ‘ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির অর্থ হলো, প্রচলিত হামলাও উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ আত্মঘাতী ড্রোনগুলো যদি বড় সংখ্যায় প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।’

তার ভাষ্য, ‘পাল্টাপাল্টি হামলা কখনোই এই সংঘাতের সমাধান করবে না।’

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমস এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একটি সূত্রের মতে, যুদ্ধ চলাকালে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা হয়েছে।

এর আগে, এপ্রিল মাসে সিএনএন জানিয়েছিল, যুদ্ধের শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ শতাংশ টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

যুদ্ধের এমন পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার (৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের নেতৃত্বকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের দ্বিমুখী’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। তার সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে তেহরানের অবস্থান তার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এমন মন্তব্য করেন তিনি।

পরে ট্রাম্প বলেন, চুক্তিতে সই করার জন্য এটিই ইরানের ‘শেষ সুযোগ’। তবে আলোচনার জন্য তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছেন না বলেও জানান। কারণ, তিনি আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। একইদিন, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামনে এখন ‘শিরশ্ছেদের আগে শেষ সুযোগ’ রয়েছে।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত ইরান যুদ্ধের প্রথম দিকেই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলা এবং শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। আগের সিএনএন প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর। চলতি অর্থবছরের সরবরাহ সূচক অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে প্রায় ১৫টি নতুন টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে।

সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

তবে ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উদ্যোগ জোরদার করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর। চলতি সপ্তাহেই প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের রকেট মোটর উৎপাদন বাড়াতে দুটি চুক্তি করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের ফল কবে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময় জানাতে রাজি হয়নি ম্যান প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিরক্ষা দফতরের এক মুখপাত্র।

সমর বিশ্লেষকদের মতে, প্যাট্রিয়টের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। কারণ এসব অস্ত্র তৈরিতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।

অন্যদিকে, প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল ও জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল-এর মতো কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। 

সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব অস্ত্রের মজুত ২০২৭ সালের মাঝামাঝি থেকে শেষ নাগাদ যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে।

/এআই 

Logo