×
Logo

আন্তর্জাতিক

আরব নিউজের প্রতিবেদন

ইসরায়েলি হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ বছর পর ৪০ শিশুসহ ১১২ মরদেহ উদ্ধার, গাজায় গণদাফন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১ এএম

ইসরায়েলি হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ বছর পর ৪০ শিশুসহ ১১২ মরদেহ উদ্ধার, গাজায় গণদাফন

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চাপা পড়ে ছিল স্বজনদের মরদেহ। অবশেষে, মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তাদের মধ্যে ৪০ শিশুসহ ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করে দাফন করেছে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো।

২০২৩ সালের নভেম্বরে, গাজা সিটির একটি আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

মঙ্গলবারের (৪ আগস্ট) জানাজা ও দাফন ছিল গাজায় চলমান যুদ্ধ শুরুর পর অন্যতম বড় গণদাফন। পাশাপাশি ওই একই স্থানে আরও অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এরপর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এখনও খুবই বিরল।

গাজায় মঙ্গলবারের হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক আহমাদ আলহেন্দাওয়ি।

তিনি বলেন, ‘গাজায় আজ আমরা হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখছি। বহু শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের পরিবার এবং স্বজনরা শেষ পর্যন্ত তাদের প্রিয়জনদের দাফন করতে পারছেন।’

‘কোনো পরিবারকে সন্তানের মৃত্যু সহ্য করার পর আবার তার মরদেহ দাফন করতে না পারার এই অবমাননাকর যন্ত্রণা ভোগ করা উচিত নয়। অথচ গাজার অসংখ্য পরিবারের বাস্তবতা এখন এমনই,’ যোগ করেন তিনি।

মরদেহ উদ্ধারে বিলম্বের জন্য ইসরায়েলের আরোপ করা বিভিন্ন বিধিনিষেধকে দায়ী করেন আলহেন্দাওয়ি।

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনও উদ্ধার ও অনুসন্ধানকারী দলগুলোর প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি, বিশেষায়িত সরঞ্জাম এবং ফরেনসিক সহায়তাও প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

পরিবারগুলোর স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার, শনাক্ত এবং শোক পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে এসব বিধিনিষেধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে গাজায় বিমান হামলা বন্ধেরও দাবি জানান আলহেন্দাওয়ি।

প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরাই। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে শিশুদের ওপর যে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে, তার চিত্রও উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আহত হয়েছে আরও ৪৪ হাজারের বেশি শিশু। এদের অনেকেই অঙ্গহানিসহ এমন গুরুতর আঘাত পেয়েছে, যার প্রভাব সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

গত ২৩ জুন, প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন বলেছে, শিশুদের ওপর এই ক্ষতি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে।

দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, ‘প্রমাণ বলছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং হত্যা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও শিশুরা নিহত ও গুরুতর আহত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক আইনে ফিলিস্তিনি শিশুদের যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, ইসরায়েল তা অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করছে।’

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত, ব্যাপক মানসিক বিপর্যয়, এতিম হয়ে যাওয়া, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রতিবন্ধিতা, বারবার বাস্তুচ্যুতি, অনাহার এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন, সব মিলিয়ে গাজার শিশুদের শৈশব-ই যেন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

এসব ক্ষতের প্রভাব তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে বলেও উল্লেখ করেছে কমিশন।

যুদ্ধের ভয়াবহতা গাজার পরিবারগুলোর কাছে কেবল নিহত মানুষের সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যু সেখানে একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প।

মধ্য গাজার চার সন্তানের মা ও শিল্পী মাইশা ইউসুফ বলেন, তার সন্তানদের হারানোর অভিজ্ঞতা বড়ই তিক্ত।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে গাজার মানুষ ‘শুধুই সংখ্যা’—এমন মন্তব্য করে ইউসুফ বলেন, তার সন্তানদের সামাজিক জীবনও যুদ্ধের কারণে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে তার বন্ধুদের হারিয়েছে, তারা সবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। শুধু তাই নয়, সে তার শিক্ষকদেরও হারিয়েছে। সবাই নিহত হয়েছেন। আমার ছেলের অবস্থাও একই। তাদের পুরো সামাজিক জগতটাই হারিয়ে গেছে।’

‘যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই তার এক বন্ধু নিহত হয়। এরপর তার শিক্ষক, তারপর আরেক বন্ধু—এভাবেই একের পর এক মানুষকে হারিয়েছে সে,’ বলেন ইউসুফ।

তার ভাষায়, ‘এত মানুষ নিহত হওয়ায় শিশুদের জীবনে হারানোর বিষয়টি এখন বিশাল এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি কীভাবে একটি শিশুকে বলবেন, “সব ঠিক আছে, জীবন চালিয়ে যাও। তারা আরও ভালো জায়গায় চলে গেছে, আর আমরা এখনও এখানে আছি?'

শোক, ভয় ও মানসিক আঘাতের পাশাপাশি গাজার অনেক শিশুকেই এখন পরিবারের টিকে থাকার জন্য বড়দের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করা কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পরিবারের জন্য অল্প পরিমাণ খাবার সংগ্রহ করা, এসবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জ’স ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ডা. জিদা আলহাকিম বলেন, ‘বেঁচে থাকাটাই যখন একটি শিশুর পূর্ণকালীন দায়িত্বে পরিণত হয়, তখন এমনটাই ঘটে।’

শিশুরা যখন বয়সের তুলনায় বড়দের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়, মনোবিজ্ঞানে তাকে ‘প্যারেন্টিফিকেশন’ বলা হয় বলে জানান তিনি।

তবে গাজার বাস্তবতা পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত এই ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল বলে মনে করেন আল হাকিম। তার মতে, এখানে পারিবারিক অস্বাভাবিকতার কারণে নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুরো একটি প্রজন্মকে বড়দের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে।

তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও শিশুদের মানসিক শক্তির একটি দিক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আল হাকিম বলেন, গবেষণায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতেও মানুষের জীবনের অর্থবোধ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল থাকতে পারে। গাজার ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘সবর’-এর ধারণার মাধ্যমে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। ইসলামি ও ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে নিহিত ধৈর্য, সম্মিলিত সহনশীলতা ও দৃঢ়তার এই ধারণা আশাবাদী হওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই মানুষের মর্যাদা ধরে রাখতে সহায়তা করে।

তার ভাষায়, ‘যে শিশু পানি বহন করছে, সে শুধু কষ্টই ভোগ করছে না; সে হয়তো এটাও বুঝতে পারছে যে পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য সে অবদান রাখছে। মানসিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) ৪০ শিশুসহ যাদের দাফন করা হয়েছে, তাদের মরদেহ যে ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি গাজার এমন শত শত যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থানের একটি, যেগুলো এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

এসব ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষের মরদেহ পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চার সন্তানের মা মাইশা ইউসুফ বলেন, ‘এখানে সংখ্যাটা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।’

‘আমরা এই ধারণাটি মানতে চাই না। কিন্তু আজ আমরা নিশ্চিত, আমরা শুধুই সংখ্যা। ইসরায়েল যা ইচ্ছা করছে, তাই করছে এবং এর জন্য কেউ তাদের জবাবদিহির আওতায় আনছে না,’ বলেন তিনি।

/এআই 

Logo