×
Logo

আন্তর্জাতিক

সিএনএন এক্সক্লুসিভ

ইরানকে চাপ ও শাস্তি দিতে মিলিটারি অ্যানালিস্টদের ই-মেইল মার্কিন কমান্ডের, ‘আমাদের দরকার আইডিয়া’

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

ইরানকে চাপ ও শাস্তি দিতে মিলিটারি অ্যানালিস্টদের ই-মেইল মার্কিন কমান্ডের, ‘আমাদের দরকার আইডিয়া’

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে নতুন কৌশল খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিকে চাপের মধ্যে রাখা ও শাস্তি দিতে ‘সৃজনশীল এবং প্রচলিত ধারার বাইরে’ কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা জানতে সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে নতুন ধারণা চেয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক্সক্লুসিভ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী মার্কিন সামরিক কমান্ডের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পাঠানো ই-মেইলে লেখা ছিল—‘উই নিড আইডিয়াস।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় গ্রুপকে ই-মেইল পাঠান। সেখানে তিনি ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি ও দেশটিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ‘নতুন, সৃজনশীল এবং অপ্রচলিত’ উপায় খুঁজতে সবার কাছে পরামর্শ চান।

আরেকটি সূত্রও জানিয়েছে, গত সপ্তাহে, সেন্টকমের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ইরানকে মোকাবিলায় নতুন কৌশলের বিষয়ে ধারণা চেয়ে একই ধরনের বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

ই-মেইলে ধারণা চাওয়াকে অস্বাভাবিক বলছেন কর্মকর্তারা

সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ই-মেইলের মাধ্যমে এভাবে সবার কাছ থেকে কৌশল বা পরিকল্পনার ধারণা চাওয়া বেশ অস্বাভাবিক। তবে এর মধ্য দিয়ে ইরানকে নিজেদের শর্তে কোনো চুক্তিতে রাজি করাতে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে থাকা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর বিকল্পগুলোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নতুন কোনো পথ বের করার আশায় সেন্টকমের ওই কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক ধরনের ‘ব্রেইনস্টর্মিং’ শুরু করেন। উদ্দেশ্য—ইরানের বিরুদ্ধে প্রচলিত সামরিক পদক্ষেপের বাইরে আরও কার্যকর কোনো কৌশল কারও কাছে আছে কি না, তা খুঁজে দেখা।

দ্বিতীয় সূত্রটি জানিয়েছে, ইরানকে মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব ধরনের বিকল্পই পর্যালোচনা করছে সেন্টকম। একই সঙ্গে নিজেদের কৌশল নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও স্বীকার করেছে কমান্ডটি।

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সৃজনশীল উপায়ে চিন্তা ও কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের।’ 

তিনি বলেন, বিশেষকরে, অ্যাডমিরাল কুপার সর্বোচ্চ মাত্রার সামরিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পদমর্যাদা নির্বিশেষে কমান্ডের সদস্যদের কাছ থেকে মতামত নেন।

ট্রাম্পের নতুন হামলার হুমকির আগেই বার্তা

সেন্টকমের ওই ই-মেইলটি পাঠানো হয়েছিল ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর হুমকি দেওয়ার আগেই। পরে অবশ্য সপ্তাহান্তে সেই হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন ট্রাম্প।

আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের পর ট্রাম্প হামলা স্থগিত করেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজও ছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে ফোন করে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের হুমকি কমানো এবং তেহরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।

তবে এত হামলার পরও এখন পর্যন্ত কোনো চুক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

পরমাণু স্থাপনায় নতুন হামলার প্রস্তুতি

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার কথা বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে দেশটির অবশিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ফের ব্যাপক হামলা চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

গত গ্রীষ্মে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’সহ আরও কয়েকটি স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এসব স্থানে পারমাণবিক উপাদান অথবা সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করেও এসব স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে। কারণ, এগুলোর অনেকগুলোই মাটির অনেক গভীরে নির্মিত।

এসব স্থাপনা ধ্বংস করতে শেষ পর্যন্ত স্থলবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেটি হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে মার্কিন সেনাদের হতাহতের তথ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এখন পর্যন্ত যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প এমন এক ধরনের হামলার কথাও বিবেচনা করছেন, যাকে তিনি ‘ফায়ারওয়ার্কস’ প্রদর্শনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এই হামলায়, গত বছরের অভিযানে লক্ষ্যবস্তু করা একই বা কাছাকাছি স্থাপনাগুলোতে ফের আঘাত হানা হতে পারে। উদ্দেশ্য হতে পারে একটি প্রতীকী সামরিক বিজয় দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা।

তবে এতে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা। তবে বাস্তবে অর্জিত হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর এমন হামলা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিরোধেরও সমাধান করবে না। সেটি হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের দাবি।

পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র বলেন, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প একটি চুক্তি চাইবেন। তাই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে তিনি ক্রমাগত কঠোর হওয়ার বিভিন্ন উপায় খুঁজবেন।

ওই সূত্রের ভাষ্য, প্রচলিত সামরিক বিকল্পগুলো যখন ফুরিয়ে আসতে থাকে, তখনই ‘সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন হয়।’

শুধু বিমান হামলায় ইরানের অবস্থান বদলাবে না: গোয়েন্দা মূল্যায়ন

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বিমান হামলা তেহরানের আলোচনার অবস্থান বদলাতে খুব একটা কার্যকর হবে না বলে মূল্যায়ন করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) পৃথকভাবে এমন মূল্যায়ন করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।

গত মাসে, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের তিনি বলেছিলেন, ‘বিমান বাহিনীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করার বিভিন্ন পরিকল্পনা কয়েক মাস ধরেই ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানো হয়েছে।

সেন্টকমের একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

তবে এখন পর্যন্ত এই পরিকল্পনায় অনুমোদন দেননি ট্রাম্প। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জেনারেল কেইনের সতর্কতার কথা বলা হচ্ছে। তিনি মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

এছাড়া ইরানের অবকাঠামো, যেমন, সেতু ও পানি বিশুদ্ধকরণ বা লবণাক্ত পানি থেকে সুপেয় পানি তৈরির স্থাপনায় হামলা চালালে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

স্থলবাহিনী পাঠালে ভাঙবে ট্রাম্পের বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বাড়ানোর আরেকটি পথ হলো মার্কিন সেনাদের সরাসরি স্থলযুদ্ধে নামানো। ট্রাম্প বিভিন্ন সময় এমন পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।

ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখল করা অথবা দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার মতো পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেছেন।

তবে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠালে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকদের কাছে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে পেনসিলভানিয়ায় এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি মার্কিন নাগরিকদের এমন ‘অযথা বিদেশি যুদ্ধে’ লড়াই ও মৃত্যুর জন্য পাঠাবেন না, যার কোনো শেষ নেই।

অন্যদিকে, ট্রাম্প চাইলে বর্তমান বিপজ্জনক পরিস্থিতিই চলতে দিতে পারেন। অর্থাৎ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। এতে আরও মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি সবসময়ই বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।

এ ধরনের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সেই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এর মতো রূপ নিতে পারে, যার সমালোচনা করে আসছেন ট্রাম্প নিজেই।

তবে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে শুক্রবার এক ক্যাবিনেট বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা শুধু জয় পেতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করতে থাকব। একপর্যায়ে তারা বলবে—আমরা আর এটা সহ্য করতে পারছি না।’

ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করা, স্থলবাহিনী পাঠানো কিংবা নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার পথে যাওয়া—কোন বিকল্পটি শেষ পর্যন্ত বেছে নেবেন ট্রাম্প, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

/এআই 

Logo