সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উস্কানি পরিণত হলো রাজনৈতিক ঝড়ে
স্প্যানিশ সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘ভুলভাবে প্রচার’, ইউরোপের স্বপ্নে কেউ ফিরলো মরক্কোতে, কেউ কফিনে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০১:২১ পিএম
স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় সাঁতরে প্রবেশ করা কয়েক হাজার অভিবাসীর বেশিরভাগই এখন মরক্কোতে ফিরে গেছে। বৃহস্পতিবারের (৩০ জুলাই) ওই নজিরবিহীন অভিবাসন ঢলের পর স্পেনে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক। একইসঙ্গে, এই বিতর্ক ছড়িয়ে পরেছে গোটা ইউরোপজুড়ে।
তবে আকস্মিক এই অভিবাসন প্রবাহের পেছনে রেখে গেছে এক মর্মান্তিক চিত্র। অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। সমুদ্র থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে পরিত্যক্ত রাবারের টিউব ও সাঁতারের সরঞ্জামের পাশে ভাসছিল মরদেহগুলো।
সেউতার এই ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করেনি, বরং ইউরোপের রাজনীতিতেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের বিভাজন আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হঠাৎ করে এত মানুষ কেন সেউতার দিকে ছুটে গেল? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপে সহজে প্রবেশের প্রলোভন ছড়িয়ে পড়েছিল, নাকি এর পেছনে ছিল আরও পরিকল্পিত কোনো উদ্যোগ?
অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপের রাজনীতিতে উত্তাপ
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের কিছু দেশের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার অভিযোগ, সংকটের সময় সহযোগিতার বদলে কেউ কেউ স্পেনকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করছে।
বিশেষকরে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কট্টর ডানপন্থি দল ‘ফ্রাতেল্লি দ'ইতালিয়া’ সেউতায় অভিবাসীদের ছুটে যাওয়ার ছবি প্রকাশ করে স্পেনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে।
পোস্টে লেখা হয়, 'এটাই সেই সানচেজ মডেল, যা ইতালির বামপন্থিরা এত পছন্দ করে।'
এরপর মেলোনি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির আওতায় অবাধ চলাচল সাময়িক স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তিনি এটিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে মাদ্রিদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেউতা শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয়। তাই মরক্কোর অভিবাসীরা অবাধে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারত না।
স্পেনের মতে, মেলোনি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিষয়টিকে ব্যবহার করছেন। কারণ, আগামী বছর ইতালিতে নির্বাচন হওয়ার কথা এবং তার জোট একটি নতুন অভিবাসনবিরোধী দলের চাপে রয়েছে।
স্পেনের ‘সফট’ অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক
শুধু ইতালি নয়, ইউরোপের আরও কিছু দেশ স্পেনকে অভিবাসন ইস্যুতে তুলনামূলক উদার বলে মনে করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেলোনির আহ্বানে মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠকের প্রস্তাবে প্রায় দুই ডজন দেশের নেতা সমর্থন দেন। তারা ইউরোপে অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে পারে, এমন নীতিগুলো বাতিলের আহ্বান জানান।
তাদের ইঙ্গিত মূলত স্পেনের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের দিকে, যেখানে কয়েক লাখ অনিবন্ধিত অভিবাসীকে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
স্পেন সরকারের যুক্তি, দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং অর্থনীতির জন্য নতুন কর্মী প্রয়োজন।
তবে সেউতার উপকূলে ছুটে যাওয়া অভিবাসীরা এমন কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে যায়নি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে প্রবেশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল বার্তা
প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অবশ্য সাম্প্রতিক একটি আদালতের রায়কে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সমুদ্রপথে প্রবেশকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।
সানচেজের দাবি, পাচারকারীরা এই রায়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করে ইউরোপে সহজ প্রবেশের সুযোগ হিসেবে প্রচার করেছে।
তবে সেউতার দিকে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। এই পথ তাদের পরিচিত ছিল এবং এজন্য অনেকেরই পাচারকারীদের অর্থ দিতে হয়নি।
বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে নানা বার্তা। অভিবাসীরা সাংবাদিকদের এমন পোস্ট দেখিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে, 'স্পেন উন্মুক্ত'।
বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্টে দেখা গেছে, তরুণরা সাঁতারের পোশাক ও ফ্লিপার পরে সমুদ্রে নামছে কিংবা সাঁতার কাটার ভিডিও ধারণ করছে। কিছু অ্যাকাউন্টটি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই খোলা হয়েছিল।
কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতিই ছিল বিভ্রান্তিকর। সেউতার তীরে পৌঁছে অনেকেই বাস্তবে কোনো আশ্রয় বা খাবার পায়নি। ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় বেশির ভাগ মানুষ দ্রুত মরক্কোতে ফিরে যায়।
অভিবাসীদের ‘ব্যবহার’ করা হয়েছে কি না, প্রশ্ন
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—কয়েক বছর আগেম, বেলারুশ সীমান্ত সংকটের মতো অভিবাসীদের কি কোনো পক্ষ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে?
এখন পর্যন্ত এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন পক্ষ ইতোমধ্যেই এই ঘটনার রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইস-এর সাংবাদিক আন্দ্রেয়া রিজ্জি লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থিরা এই ঘটনায় 'অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত'।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘটনাটিকে 'বিপর্যয়' ও 'আক্রমণ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে স্পেনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিরোধও রয়েছে।
রাশিয়াও ইউরোপের এই বিভাজনকে স্বাগত জানিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। ইউরোপের মিত্রদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা মস্কোর জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
অন্যদিকে, মরক্কো এই ঘটনার জন্য 'অপরাধী সংগঠনগুলোকে' দায়ী করেছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সীমান্তে এত মানুষের জড়ো হওয়ার বিষয়টি দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী কীভাবে আগে বুঝতে পারেনি।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করছে স্পেন
বর্তমানে, সেউতায় নতুন করে এমন ঘটনা ঠেকাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে স্পেন। সমুদ্রের দিকে সীমান্ত বেড়া বাড়ানো হচ্ছে এবং বন্দরের কাছে কমলা রঙের ভাসমান ব্যারিয়ার বসানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে নৌ-[টহলের মাধ্যমে এগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।
আগামী সপ্তাহে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা চলমান সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার নিয়ে আলোচনা করবেন। এ ঘটনায় ইউরোপের কট্টর অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
তবে সামগ্রিকভাবে ইউরোপের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন এখনো আসেনি।
কিন্তু সাগরে নেমে ইউরোপে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখা সেই তরুণদের জন্য পরিণতি হয়েছে ভিন্ন। অনলাইনে দেখা এক আশার পেছনে ছুটে যাওয়া অনেকেই এখন মরক্কোতে ফিরছেন—কেউ জীবিত, কেউ কফিনে।
/এআই