রয়টার্স স্পেশাল স্টোরি
৪ বিলিয়ন ডলারের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করেছে অবৈধ ইরানি গেম্বলিং নেটওয়ার্ক
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুবাইভিত্তিক একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ, যা অবৈধ জুয়া ব্যবসা, বিটকয়েন মাইনিং, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করেছে বলে দাবি করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধান।
ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেলবিট নামের একটি অনিবন্ধিত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, ইরানের অর্থ স্থানান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। দুবাইয়ের একটি এলাকায় অবস্থিত একটি সুলভমূল্যের বাজেট হোটেলের ওপরের তলায় থাকা একটি অফিসকে শেলবিটের নিবন্ধিত ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে, সেখানে গিয়ে রয়টার্সের সাংবাদিক ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাননি বলে দাবি করেছেন।
দুটি ক্রিপ্টো তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান এবং একজন স্বাধীন ব্লকচেইন বিশ্লেষকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে শেলবিট কমপক্ষে ৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফারসি ভাষাভাষী একটি বিশাল অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট নিয়ে গঠিত এই জুয়া নেটওয়ার্কটি পরিচালিত হয় দুই জনপ্রিয় ইরানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তারকার মাধ্যমে।

তাদের একজন হলেন সাশা সোবহানি এবং অন্যজন পুয়ান মোকতারি। দুজনই বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। দামি গাড়ি, ব্যক্তিগত বিমান, ইয়ট পার্টি এবং অভিজাত জীবনযাত্রার প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা লাখো অনুসারীর কাছে পরিচিত।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই ব্যক্তি এবং শেলবিটের প্রতিষ্ঠাতা শিয়াভাশ কায়ভানপুর, তিনজনই ২০২৩ সালে ইরানে অবৈধ জুয়া ব্যবসার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
সাশা সোবহানি ইরানের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও মন্ত্রীর ছেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি প্রকাশের জন্য তিনি পরিচিত। ইনস্টাগ্রামে তার লাখো অনুসারী রয়েছে। বিভিন্ন জুয়া সাইটের প্রচারও করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, পুয়ান মোকতারি একজন গায়ক ও অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার। তিনি বিলাসবহুল হোটেল, দামি গাড়ি এবং ব্যক্তিগত বিমানের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে পরিচিতি পান।
২০২৩ সালে, ইরানে অবৈধ জুয়া ব্যবসার মামলায় সোবহানি ও মোকতারিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে দুজনেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মোকতারি বলেছেন, তিনি আইআরজিসি বা কোনো ইরানি সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নন। একইভাবে সোবহানি দাবি করেছেন, অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো বা ইরানি সরকারের হয়ে অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
দুবাইভিত্তিক ভার্চুয়াল অ্যাসেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভার্চুয়াল অ্যাসেটস রেগুলেটরি অথরিটি (ভিএআরএ) শেলবিটের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছে।
তদন্তের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, শেলবিটের প্রতিষ্ঠাতা শিয়াভাশ কায়ভানপুর এবং ক্রিপ্টোভিত্তিক অবৈধ জুয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ইরানি নাগরিকদের কার্যক্রমও খতিয়ে দেখছে ভিএআরএ।
২০২৫ সালে, লাইসেন্স ছাড়া ভার্চুয়াল অ্যাসেট ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে শেলবিটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। দুবাইয়ের অর্থনীতি ও পর্যটন বিভাগও এ পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে ভিএআরএ'র কাছে মন্তব্য চাওয়ার পর, গত ২৪ জুলাই, সংস্থাটি একটি নোটিশ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, শেলবিট অর্থপাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নবিরোধী আইন লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে অবিলম্বে সব ধরনের অননুমোদিত ভার্চুয়াল অ্যাসেট কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংস্থাটির নোটিশে বলা হয়, শেলবিটের কার্যক্রম শুধু ভোক্তা সুরক্ষার বিষয় নয়; বরং সীমান্ত পেরিয়ে পরিচালিত এমন আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ইরানের অনলাইন জুয়া খাত একসময় আইআরজিসির নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসে।
সাবেক ইরানি সরকারি কর্মকর্তা রেজা ঘেইবি বলেন, প্রায় এক দশক আগে, ইরানে অনলাইন জুয়ার প্রসার শুরু হলে আইআরজিসি এতে আর্থিক সুযোগ দেখতে পায় এবং ধীরে ধীরে খাতটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার দাবি, এসব জুয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার জন্য ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সহযোগিতাও প্রয়োজন ছিল।
আইআরজিসির সঙ্গে একসময় কাজ করা হামিদ নিকু, সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেইন তোরকামান এবং আরও কয়েকজন সূত্র দাবি করে, জুয়া সাইটগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরানে জুয়া নিষিদ্ধ এবং এর জন্য কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাতের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত এই জুয়া নেটওয়ার্ক ইরানের অভ্যন্তরীণ অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
শেলবিটকে ঘিরে সন্দেহ
ক্রিপ্টো বিশ্লেষকদের মতে, শেলবিট ছিল এমন একটি কেন্দ্র, যার মাধ্যমে ইরানের জুয়া নেটওয়ার্ক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো বাজারের যোগাযোগ তৈরি হয়।
স্বাধীন ব্লকচেইন গবেষক রিচ স্যান্ডার্স বলেন, শেলবিটের কার্যক্রমের ধরন দেখে এটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হয়।
তিনি দাবি করেন, 'এটি আইআরজিসির একটি কার্যক্রম এবং বিষয়টি খুবই স্পষ্ট।'
তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি যে আইআরজিসি সরাসরি শেলবিট বা এই জুয়া নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতো কি না। একইভাবে, এই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়েছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেলবিট বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে (Binance) কয়েকশ' মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো স্থানান্তর করেছে।
এছাড়া শেলবিটের লেনদেনের সঙ্গে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা কিছু আইআরজিসি-সম্পর্কিত ওয়ালেট এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ নোবিটেক্সের যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও লেনদেন
রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার সময়ও শেলবিটের মাধ্যমে অর্থ প্রবাহ অব্যাহত ছিল। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলার পরও এই লেনদেন বন্ধ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান কীভাবে বিকল্প আর্থিক পথ তৈরি করেছে, এই নেটওয়ার্ক তার একটি উদাহরণ।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন ৩০ জনের বেশি ব্যক্তি, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, আইআরজিসির সঙ্গে একসময় যুক্ত ব্যক্তি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তদন্ত সম্পর্কে অবগত কয়েকজন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের অর্থনীতিতে আইআরজিসির প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
/এআই