ভারতের সংসদে জেন-জি ভাষার ঝড়
‘কুচু-পুচু’ থেকে ‘ডেলুলু’— ইন্টারনেটের স্ল্যাং এখন রাজনীতির ভাষা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
ভারতের সংসদে রাজনৈতিক ভাষার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। যে শব্দগুলো এতদিন ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম পেজ, কে-পপ ফ্যান কমিউনিটি কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটেই বেশি শোনা যেত, সেগুলোই এখন লোকসভার আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা বক্তব্যে ব্যবহার করেছেন ‘ডেলুলু’, ‘ক্লক ইট’, ‘এফওএমও’, ‘এমআইএ’, ‘কুচু-পুচু’ ও ‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’র মতো জেন-জি প্রজন্মের জনপ্রিয় শব্দ। ফলে সংসদের ভাষা যেন অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে। VIDEO | Parliament Monsoon Session 2026: Speaking in the Lok Sabha, Union Minister of State Jitendra Singh says, "One of our respected members pointed out that, initially, the Opposition was reluctant to associate itself with this protest because they believed it was an Aam Aadmi… pic.twitter.com/C66V20xtUB
এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ দেন ৬৯ বছর বয়সী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। বিরোধী দলকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা 'এমআইএ' বা ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’ হয়ে গিয়েছিল এবং পরে সম্ভবত ‘এফওএমও’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’-এর কারণেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে বিজেপি সাংসদ বাঁশুরি স্বরাজ সরকারকে সমর্থন করতে গিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমস্যাকে ‘ক্লক ইট’ করেছেন— অর্থাৎ সঠিকভাবে শনাক্ত করে সমাধান তৈরি করেছেন। আবার বিজেপির তেজস্বী সূর্য বিরোধীদের ‘ডেলুলু’ বা বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে মন্তব্য করেন। “PM Modi clocked it” जैसा Gen-Z कहती है।यानी समस्या को समय रहते पहचाना, निर्णायक निर्णय लिया और व्यवस्था को जवाबदेह बनाया।
फर्क साफ है। सोच का भी, शासन का भी और संकल्प का भी।
UPA का मंत्र था:
Delay • Deflect • Deny
मोदी सरकार का मंत्र है:
Detect • Decide • Deliver
30 साल… pic.twitter.com/WO8tLCuRiy
এছাড়া কংগ্রেস সাংসদ দীপেন্দর হুডা সংসদে ‘কুচু-পুচু’ ও ‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’ ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করেন। এসব শব্দের ব্যবহার সংসদের প্রচলিত ভাষা ও শৈলীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। Congress MP Deepender Hooda Brings Gen-Z Slang to Lok Sabha, Says 'Kuchu Puchu' and 'Vasteguna Huiya pic.twitter.com/EaDQi0VLN3
‘ক্লক ইট’: সত্যটা ধরিয়ে দেওয়া
‘ক্লক ইট’ শব্দটির উৎপত্তি ইন্টারনেটে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান-আমেরিকান বলরুম সংস্কৃতিতে। সেখানে কাউকে ‘ক্লক’ করার অর্থ ছিল তার কোনো ভুল, অসঙ্গতি বা গোপন বিষয় ধরে ফেলা। পরে ড্র্যাগ সংস্কৃতি এবং ‘রু পল'স ড্র্যাগ রেস’-এর মতো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় হয়। বর্তমানে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে জেন-জি প্রজন্ম এটি ব্যবহার করে কোনো বিষয় সঠিকভাবে বুঝে ফেলা, বাস্তবতা উপলব্ধি করা বা সত্য কথা বলে দেওয়ার অর্থে।
‘ডেলুলু’: কল্পনার জগতে বাস করা
‘ডেলুলু’ এসেছে ইংরেজি ‘ডিলিউশনাল’ শব্দ থেকে। প্রথমে কে-পপ ফ্যানডমে এটি জনপ্রিয় হয়। ভক্তরা মজা করে নিজেদের অবাস্তব কল্পনা— যেমন প্রিয় শিল্পী গোপনে তাদের ভালোবাসেন। এসবকে ‘ডেলুলু’ বলতেন। ধীরে ধীরে শব্দটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এখন এমন কাউকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যিনি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, অতিরিক্ত আশাবাদী বা বিভ্রান্ত।
‘এফওএমও’: সুযোগ হারানোর ভয়
এফওএমও-এর পূর্ণরূপ ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’। এটি সোশ্যাল মিডিয়ার আগেই ২০০০-এর দশকের শুরুতে মনোবিজ্ঞান ও বিপণন জগতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর অর্থ হলো, অন্যরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা বা সুযোগ পাচ্ছে, অথচ আমি তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি— এমন এক ধরনের মানসিক উদ্বেগ। ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বর্তমানে ব্যক্তিগত জীবন ছাড়াও রাজনীতি, ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
‘এমআইএ’: হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া
‘এমআইএ’ মূলত সামরিক পরিভাষা। এর পূর্ণরূপ ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’, অর্থাৎ যুদ্ধে নিখোঁজ। তবে ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে এটি নতুন অর্থ পেয়েছে। এখন কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনজীবন বা কোনো আলোচনায় অনুপস্থিত হয়ে যান, তখন তাকে ‘এমআইএ’ বলা হয়।
‘কুচু-পুচু’: আদরের ভাষা থেকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ
‘কুচু-পুচু’র নির্দিষ্ট কোনো উৎস নেই। এটি বহু ভারতীয় ভাষায় শিশুদের সঙ্গে আদুরে ভাষায় কথা বলার একটি স্বাভাবিক রূপ। ‘কুচি-কুচি’, ‘গুচু-পুচু’, ‘কুচি-পু’ ইত্যাদি ছন্দময় শব্দের মতোই এটি শিশু, প্রিয়জন বা পোষা প্রাণীকে আদর করে ডাকার ভাষা।
সাম্প্রতিক সময়ে ইনস্টাগ্রাম রিল, ইউটিউব শর্টস ও মিম সংস্কৃতির মাধ্যমে ‘কুচু-পুচু’ নতুন অর্থ পেয়েছে। এখন এটি অনেক সময় ব্যঙ্গ করে এমন কাউকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাকে অতিরিক্ত আদর করা হয়, শিশুসুলভ আচরণ করে বা বাস্তবতা থেকে দূরে থাকে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-নেতৃত্বাধীন ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের কটাক্ষ করতেও শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’: অর্থহীন শব্দ, কিন্তু ভাইরাল ট্রেন্ড
‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’ এসেছে ভাইরাল মিম ‘ক্যান আই গেট এ হুইয়া?’ থেকে। ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতারা মূল বাক্যটি পরিবর্তন করে ‘ভাস্তেগুনা হুইয়া’ বানান। এর কোনো আক্ষরিক অর্থ নেই। বরং এর জনপ্রিয়তা এসেছে মানুষের বিভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া ও হাস্যরস থেকে। পরে এটি মিম, রিল, কমেন্ট সেকশন এবং ছাত্র আন্দোলনের স্লোগান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
কেন জেন-জি ভাষা এখন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষাগত পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সিজেপি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন যেমন রাস্তায় হয়েছিল, তেমনি ইনস্টাগ্রাম, এক্স, মিম ও ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমেও সংগঠিত হয়েছিল। তরুণদের কাছে এখন রাজনীতি পৌঁছায় রিল, শর্ট ভিডিও ও মিমের মাধ্যমে। দীর্ঘ সংসদীয় বক্তৃতার তুলনায় একটি ভাইরাল ভিডিও অনেক বেশি মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রাম রিল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতে প্রতি নির্বাচনে লাখ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হচ্ছে। ফলে তরুণদের ভাষায় কথা বলা এখন রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
ভারতের সংসদে জনপ্রিয় ভাষার ব্যবহার নতুন নয়
জেন-জি স্ল্যাং নতুন হলেও জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভাষা সংসদে ব্যবহারের ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতার পরের দশকগুলোতে সংসদে ভগবদ্গীতা, মির্জা গালিব বা আল্লামা ইকবালের কবিতা উদ্ধৃত করা হতো। পরে বলিউডের সংলাপ, ক্রিকেটের উপমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভাষাও রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ হয়ে ওঠে।
রাহুল গান্ধীর ‘গাব্বার সিং ট্যাক্স’ মন্তব্য কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘শোলে’ সিনেমার ‘মৌসি’ চরিত্রের সংলাপ ব্যবহার— এসবই দেখায় যে সংসদ সব সময় সময়ের জনপ্রিয় ভাষাকে গ্রহণ করেছে। ক্রিকেটের ভাষাও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত হচ্ছে— যেমন ‘ছক্কা মারা’, ‘ক্লিন বোল্ড’, ‘ব্যাকফুটে চলে যাওয়া’ কিংবা বাজেটকে ‘ইনিংস’ হিসেবে বর্ণনা করা।
ডিজিটাল যুগে বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক ভাষা
ভাষাবিদদের মতে, প্রতিটি প্রজন্মই মনে করে পরবর্তী প্রজন্মের ভাষা অদ্ভুত। একসময় ‘কুল’, ‘অসাম’, ‘ডুড’ কিংবা ‘এলওএল’ শব্দগুলোও শুধুই তরুণদের ভাষা ছিল। পরে সেগুলো মূলধারার অংশ হয়ে যায়। জেন-জি’র বর্তমান শব্দভাণ্ডারও একই পথ অনুসরণ করছে।
কে-পপ ফ্যানডম, গেমিং কমিউনিটি, টিকটক ট্রেন্ড, আমেরিকান ড্র্যাগ রেস সংস্কৃতি কিংবা মিম পেজ— এসব ডিজিটাল সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেওয়া শব্দ এখন ভারতের সংসদেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভাষার বিস্তারকে কতটা দ্রুত ও বৈশ্বিক করে তুলেছে।
সব স্ল্যাং হয়তো টিকে থাকবে না, কারণ ইন্টারনেটের ভাষা খুব দ্রুত বদলায়। তবে কিছু শব্দ অনলাইন জগৎ পেরিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষার অংশ হয়ে যায়। আর যখন সেই শব্দ সংসদে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটি ইঙ্গিত দেয় যে শব্দগুলো ইতোমধ্যেই মূলধারার সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনীতি এখন শুধু আদর্শগত বক্তৃতা বা সংসদীয় বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মিম, ইনফ্লুয়েন্সার, ভাইরাল ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একই ডিজিটাল পরিসরে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে জেন-জি’র ভাষা শুধু তরুণদের নয়, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভাষারও অংশ হয়ে উঠছে।
/এনএ