ধ্বংসস্তূপ থেকে গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠনের লড়াইয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম
ইসরায়েলি হামাল্য ভেঙে পড়েছে ভবন-ল্যাবরেটরি। ছবি: আল জাজিরা।
ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। ধ্বংস হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন, গবেষণাগার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তবুও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি।
যুদ্ধ শুরুর পূর্বে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা। চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মতো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণনির্ভর বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও গবেষণা সুবিধা গড়ে তুলেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ল্যাবে সময় কাটাতেন। চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার, নমুনা পরীক্ষা এবং শ্রেণিকক্ষে শেখা তত্ত্ব বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের প্রস্তুতি নিতেন তারা।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বদলে যায় সবকিছু। ধারাবাহিক হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। একই সঙ্গে গাজার ওপর কঠোর অবরোধের কারণে শিক্ষা উপকরণ আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি সমন্বয়কারী ইয়াসিন জানান, যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিভাগের জন্য নতুন অ্যানাটমি মডেল এবং প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছায়।
এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই উদ্যোগ আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত বিশ্ববিদ্যালয়
ইসরায়েলি হামলায়, ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ১৯টি শিক্ষাভবন ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০০টি শ্রেণিকক্ষ, ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং ৭৫টি কম্পিউটার ল্যাব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার হারিয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বই, গবেষণা সাময়িকী, রেফারেন্স উপকরণ ও একাডেমিক থিসিস।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন আবদুল রউফ আল-মানামা বলেন, গত তিন বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সময়গুলোর একটি।
তার ভাষ্য, হামলায় শুধু ভবন নয়, ধ্বংস হয়েছে গবেষণার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ক্লিনিক, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং পাঁচ দশকে গড়ে ওঠা জ্ঞানভাণ্ডারের বড় অংশ।
তিনি বলেন, এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মূলত একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশিষ্টাংশ।
যুদ্ধের সময় ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভবন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। শ্রেণিকক্ষের সংকট, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মানসিক চাপ শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ল্যাবের পরিবর্তে ভিডিও, শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে হাসপাতাল
ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনেসকোর যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের পর গাজার অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক বিশেষায়িত গবেষণাগার এখন আর ব্যবহারযোগ্য নেই।
ফলে যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য, সেগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই তাত্ত্বিক পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
এই সংকট মোকাবিলায়, বিশ্ববিদ্যালয় ভার্চুয়াল সিমুলেশন, ভিডিওভিত্তিক পরীক্ষা এবং রেকর্ড করা ল্যাব সেশন ব্যবহার করছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি, মলিকুলার ডায়াগনস্টিকস, মেডিকেল অপটিক্স ও ফিজিওথেরাপির মতো বিষয়েও এসব বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে আল-মানামার মতে, এসব ব্যবস্থা সাময়িক সমাধান মাত্র। বাস্তব ল্যাবরেটরির অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা সম্ভব নয়।
চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের নতুন শ্রেণিকক্ষ—হাসপাতাল
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেনের কাছে বদলে গেছে পুরো শিক্ষাজীবন। যুদ্ধের আগে, তিনি নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিতেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, মেডিসিন অনুষদ ধ্বংস হওয়ার পর, তার পড়াশোনার বড় অংশই চলে যায় হাসপাতালকেন্দ্রিক বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।
তিনি বলেন, অনেক সময় হাসপাতালের করিডোরে কিংবা রোগীর কক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হয়েছে।
দিমার ভাষ্য, 'অনেক ক্ষেত্রে আমরা হাসপাতালের এক কোণে কিংবা রোগীর কক্ষের মাঝখানে চিকিৎসকদের ঘিরে পাঠ নিয়েছি। সেখানে একটি শিক্ষার পরিবেশের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও ছিল না।'
তার মতে, চিকিৎসা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা। যুদ্ধের কারণে সেই সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
তবে থেমে থাকেননি তিনি। গাজার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার ইউনিট ও ক্ষত পরিচর্যা বিভাগে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে চিকিৎসা কার্যক্রমে আরও বড় দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পান।
নতুন বাস্তবতায় শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা
ইয়াসিন বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধান।
তিনি বলেন, আগে শিক্ষার্থীরা সরাসরি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সেগুলোর কার্যপ্রণালি শিখতেন। এখন সেই সুযোগ না থাকায় অনেকের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।
এছাড়া গাজার বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত কমে।
অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল সিমুলেশন, রেকর্ড করা ব্যবহারিক পাঠ এবং হাসপাতালভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু ভবন পুনর্নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন নতুন গবেষণাগার, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, মাইক্রোস্কোপ, ইনকিউবেটর, জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র, বিশেষায়িত কম্পিউটার, রাসায়নিক উপকরণ এবং পরীক্ষাগার সামগ্রী।
কিন্তু গাজার ওপর চলমান অবরোধের কারণে এসব সরঞ্জাম ও নির্মাণ উপকরণ আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবুও আশা হারায়নি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আজ যারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, তারাই ভবিষ্যতে গাজার পুনর্গঠনের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠবেন।
শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেন বলেন, 'আজ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে আগামী দিনের পুনর্গঠনে বিনিয়োগ। কারণ শুধু ভবন নয়, মানুষকে পুনর্গঠন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।'
/এআই