খালিজ টাইমসের প্রতিবেদন
১৬ ঘণ্টায় ৫৪ হাজার সিঁড়ি বেয়ে এভারেস্টের সমান উচ্চতা ছুঁলেন আবুধাবির কোচ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
পাহাড়ে না গিয়েও এভারেস্ট জয়ের অনুভূতি পেলেন আবুধাবির শারীরিক প্রশিক্ষণ কোচ ভেলজকো ভুকিচেভিচ। একটি ভবনের একই সিঁড়ি বারবার বেয়ে তিনি মাত্র ১৬ ঘণ্টায় অতিক্রম করেছেন ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার উচ্চতা, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের সমান।
সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত এই কোচ প্রমাণ করতে চেয়েছেন, অসাধারণ কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব সময় অসাধারণ কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। তাই পাহাড়ে যাওয়ার বদলে আবুধাবির রিম আইল্যান্ডের একটি সাধারণ সিঁড়িকেই নিজের ‘এভারেস্ট’ বানিয়ে নেন তিনি।
এই চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করতে ভেলজকো একটি ৪৯ তলা ভবনের সিঁড়ি ৫৯ বার ওঠেন। সব মিলিয়ে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ধাপ। পুরো চ্যালেঞ্জে, তার প্রায় ৭ হাজার ক্যালরি শক্তি খরচ হয় এবং প্রতি ঘণ্টায় গড়ে চারবার করে উঠতে হয়েছে সিঁড়ি।
প্রতিবার ৪৯ তলা পর্যন্ত ওঠার পর লিফটে করে নিচে নেমে আসতেন তিনি। এরপর পানি, খেজুর, কলা, বাদাম ও আখরোট খেয়ে সামান্য বিরতি নিয়ে আবার শুরু করতেন পরবর্তী আরোহন।
সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসকে ভেলজকো বলেন, 'আমি এমন কোনো সুন্দর দৃশ্য খুঁজছিলাম না, যা আমাকে বিভ্রান্ত করবে। আমি এমন একটি পরিবেশ চেয়েছিলাম, যেখানে পুরোপুরি নিজের মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।'
গতি নয়, ধারাবাহিকতাই ছিল মূল শক্তি
সাধারণ এভারেস্টিং চ্যালেঞ্জ সাধারণত সাইক্লিং, দৌড় বা হাইকিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় এবং জিপিএসের মাধ্যমে তা যাচাই করা হয়। তবে ভেলজকোর এই অভিযান ছিল সম্পূর্ণ ইনডোর। এ কারণে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেননি তিনি।
প্রায় এক বছর ধরে এই চ্যালেঞ্জের পরিকল্পনা করেন তিনি। আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি না নিলেও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সাইক্লিং, উঁচু পথে হাঁটা, ভিওটু ম্যাক্স অনুশীলন, শরীরের ওজনভিত্তিক ব্যায়াম এবং সপ্তাহান্তে সিঁড়ি ওঠার অনুশীলন করেছেন।
ভেলজকো বলেন, তার লক্ষ্য দ্রুত ওঠা ছিল না; বরং একই গতি ধরে রাখা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আসল লড়াই ছিল নিজের সঙ্গে
ভেলজকোর মতে, শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক বাধাই ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তিনি বলেন, 'আমাদের শরীর আমরা যতটা ভাবি, তার চেয়েও অনেক বেশি সক্ষম। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল না সিঁড়ির সংখ্যা বা পায়ের ক্লান্তি; বরং মাথার ভেতরের সেই ভয়েস, যা বলছিল, এবার যথেষ্ট হয়েছে।'
ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই সিঁড়ি ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল একঘেয়ে ও কঠিন।
তিনি জানান, শেষের দিকে আর তলার সংখ্যা গুনছিলেন না, শুধু ধাপ গুনছিলেন। একপর্যায়ে সিঁড়ির একটি ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়েছিল, 'আমাকে কি সত্যিই আবার এটা করতে হবে?' পরে নিজেকেই সাহস দিয়ে আবার এগিয়ে যান।
ভেলজকোর ভাষায়, ওই মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন—লড়াই আর সিঁড়ির সঙ্গে নয়, নিজের চিন্তার সঙ্গে।
তার সঙ্গে পুরো সময় ছিলেন সহকর্মী স্রদিয়ান ওস্তোজিচ। তিনি ভেলজকোর হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ, ওঠার সংখ্যা হিসাব, খাবার ও পানি প্রস্তুত এবং প্রতিবার ওঠার পর লিফট ডাকার কাজ করেন।
‘সবারই নিজের একটি এভারেস্ট আছে’
অভিযানের সময় অনেকেই ভেলজকোর এই অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড দেখে অবাক হয়েছেন।
তিনি বলেন, 'মানুষ আমাকে অদ্ভুতভাবে দেখছিল। কিন্তু আমি শুধু পরবর্তী ওঠার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম। কাউকে যদি বলতাম আমি কী করছি, তারা হয়তো বিশ্বাস করত না।'
এত কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের পরও কয়েক দিনের মধ্যেই তার শরীর স্বাভাবিক হয়ে আসে। শুধু পায়ের পেশিতে স্বাভাবিক ব্যথা ছিল।
নিজের এই অর্জনের মাধ্যমে মানুষকে একটি বার্তা দিতে চান ভেলজকো।
তিনি বলেন, 'সবারই নিজের একটি এভারেস্ট আছে। সবাই একই পথ বেছে নেয় না, কিন্তু প্রত্যেকের নিজের কঠিন পথ রয়েছে।'
তার কাছে এই অর্জন শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়। বরং তিনি চান, তার গল্প দেখে অন্তত একজন মানুষও যেন নিজের সামর্থ্য নিয়ে নতুন করে বিশ্বাস করতে পারেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা ছাড়িয়ে প্রথম পদক্ষেপ নিতে সাহস পান।
/এআই