আরব নিউজের প্রতিবেদন
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর বাবাকে হারিয়েও ফিলিস্তিনের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সেরা গাজার সাবা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:২২ পিএম
গাজায় যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি আর বাবাকে হারানোর বেদনার মধ্যেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ। ফিলিস্তিনের জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তাওজিহিতে বিজ্ঞান বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে দেশসেরা শিক্ষার্থী হয়েছেন তিনি।
গাজার আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে থাকা সাবার অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রের তাঁবুর ঠিক বিপরীতের একটি বাড়িতে বোমা হামলা হয়েছিল তার চূড়ান্ত পরীক্ষার কয়েক দিন আগে। সেসময় প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের সঙ্গে আবারও ঘর ছাড়তে হয় তাকে। ফেলে যেতে হয় নিজেদের শেষ সম্বলটুকুও।
তবে এত প্রতিকূলতার পরও পড়াশোনার পথ থেকে সরে যাননি সাবা। এবারের তাওজিহি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে তিনি পেয়েছেন ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর, যা তাকে পুরো ফিলিস্তিনের মধ্যে শীর্ষস্থান এনে দিয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে সাবা বলেন, 'আমি ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছি এবং বিজ্ঞান বিভাগে পুরো দেশের মধ্যে প্রথম হয়েছি।'
ফল প্রকাশের পর আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে তাকে ঘিরে আনন্দে মেতে ওঠেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। গ্র্যাজুয়েশনের পোশাক পরে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ফুল গ্রহণ করেন সাবা। আনন্দের সেই মুহূর্তেও তার চোখেমুখে ছিল গভীর শোকের ছাপ। কারণ এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার বাবাকে হারানোর কষ্ট।
যুদ্ধের মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। ইসরায়েলি হামলায় গাজার অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
অনেক স্কুল ভবন পরে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে লাখো মানুষ।
এবারের তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে থাকা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে। তিন বছর পর প্রথমবারের মতো যুদ্ধের মধ্যেই এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এ বছর প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন সাবা।
বাবার স্বপ্ন পূরণের পথে সাবা
সাবার বাবা ফায়েদ রাবাহ ছিলেন জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্কুলের শিক্ষক। সাবা জানান, ২০২৪ সালের জুনে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হন।
বাবাকে হারানোর আগেই তাদের পরিবারকে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল। ইসরায়েলি বাহিনী আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে প্রবেশের পর তারা দুইবার বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, তাদের বাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়।
বাবার মৃত্যুর পর, বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা এত বেশি ছিল যে ঠিক কতবার ঘর বদলাতে হয়েছে, তা মনে করতে পারেন না সাবা।
তিনি বলেন, 'এত বাস্তুচ্যুতি, এত ভয়ে ছিলাম... আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার বইয়ের অর্ধেক হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু কখনো আমার লক্ষ্য ছেড়ে দিইনি।'
নেই বিদ্যুৎ, হামলার আতঙ্কের মধ্যেও প্রস্তুতি
পরীক্ষার সময়ও নিরাপদ ছিলেন না সাবা। পরীক্ষা শুরুর কয়েক দিন আগে, পাশের বাড়িতে, বোমা হামলার কারণে সাবা ও তার পরিবারের সদস্যদের আবারও স্থান পরিবর্তন করতে হয়।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পড়াশোনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো ব্যক্তিগত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে তাকে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে। এছাড়াও যাত্রা পথে সাবার নিরাপত্তা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।
সাবার স্বপ্ন এখন চিকিৎসক হওয়া। তিনি বলেন, 'আমার লক্ষ্য মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হওয়া, এটাই আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমার জন্য।'
তিনি আরও বলেন, তার সবচেয়ে বড় আশা হলো কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার জন্য পূর্ণ বৃত্তি পাওয়া।
আনন্দ ফিরেছে শোকাহত পরিবারে
সাবার মা ৫২ বছর বয়সী ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, দীর্ঘ শোক ও কষ্টের পর মেয়ের সাফল্য তাদের পরিবারে নতুন আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে।
তিনি জানান, অনেক সময় মোবাইল ফোনের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে সাবাকে।
এএফপিকে তিনি বলেন, 'এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি আশা করেছিলাম সে সেরা শিক্ষার্থীদের একজন হবে, কিন্তু সে পুরো ফিলিস্তিনের সেরা শিক্ষার্থী হয়েছে।'
সাবার মা বলেন, যুদ্ধ, বাবার মৃত্যু এবং বারবার বাস্তুচ্যুতির মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মেয়ের এই অর্জন তাদের জীবনে নতুন আশার আলো এসেছে।
/এআই