ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
কম খরচে মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে ‘খাইবার শেকান’ মিসাইল সংস্কার করছে ইরান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
চলছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের 'ফেজ-২'। যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে টানা ১৩তম রাতে ইরানের হামলার পর অভিযান সাময়িকভাবে থামাতে নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে, এই ১৩ দিন প্রতিপক্ষ ইরান, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে, একের পর এক মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। সামরিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হামলা অব্যাহত রাখে ইরান। একইসঙ্গে, যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও ভাবতে হচ্ছে দেশটিকে। তবে, যুদ্ধের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে, শত্রুর রণকৌশল ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করেই হামলা চালাচ্ছে ইরান। আর তাই, হামলায়, হজ কাশেম, ফাত্তাহ, খোররামশহর এবং সেজ্জিলের মতো নেক্সট জেনারেশন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার না করে, ময়দানে নামানো হয়েছে ‘খাইবার শেকান’ মিসাইল।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অস্ত্রাগারের অন্যতম প্রধান এই হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্য কি? এক কথায়—সস্তা। এছাড়াও সহজে স্থানান্তরযোগ্য ও যেকোনো টার্গেটে পারফেক্ট অ্যাকুরেসি নিয়ে লিথাল হামলা। এই মিসাইলের পাল্লা অন্তত ১ হাজার ৪শ' কিলোমিটার; যা এই যুদ্ধের কনটেক্সটে পারফেক্ট মিসিং পাজেল। কেনোনা, শত্রুর এয়ার ডিফেন্স সক্ষমতা কমানো এবং ফাঁকফোকর দিয়ে লক্ষ্যে একটি মিসাইলও যদি হিট করে,তাহলে অভিযান সফল, অন্তত ইরানের পার্সপেক্টিভ থেকে কাউন্টার-অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সাকসেস রেশিও অনেক বেড়ে যায় এবং মার্কিন সরকারকে চাপে ফেলে আবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার দরজাও খুলে যায়।
ইউএস সেনাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, জুলাই মাসে, সংঘাতের দ্বিতীয় দফা শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক খাইবার শেকান ছুড়ছে ইরান। কিন্তু কেন এই মিসাইল-ই হামলায় ব্যবহার করছে ইরান?
সমর বিশ্লেষকদের দাবি, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা এখন এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। একইসঙ্গে নানা রকম উড্ডয়ন-পথ (ফ্লাইট পাঠ), রণকৌশল ও গতির মিশ্রণ ঘটিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে।
খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো আগে থেকেই জ্বালানি ভরা অবস্থায় রাখা যায় এবং দ্রুত ট্রাক বা অন্য যানবাহনে তুলে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। ফলে হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কম লাগে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসের জন্য নজরদারি চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে এড়িয়ে চলা সহজ হয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের পুরোনো অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে জ্বালানি রিফিলের প্রয়োজন হতো, যা ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া। খাইবার শেকান সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দ্রুত হামলার সুযোগ তৈরি করেছে।
যদিও চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বেশিরভাগ 'খাইবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান বিভিন্ন উড্ডয়ন পথ, গতি ও কৌশল পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। উচ্চমাত্রার গতিপথ পরিবর্তন সক্ষমতার কারণে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করাও তুলনামূলক কঠিন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের সামনের অংশে থাকা ছোট ইঞ্জিন বিস্ফোরক বহনকারী ওয়ারহেডকে শেষ পর্যায়ের উড্ডয়নে দিক পরিবর্তনে সহায়তা করে। লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার সময় এগুলো ঘণ্টায় প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান 'খাইবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ড্রোন এবং তুলনামূলক কম উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার এবং সেনাদের আবাসিক স্থাপনা।
পূর্বের ব্যর্থ হামলা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে ইরান
সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান জেনারেল জোসেফ ভটেলের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরান আগের হামলার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে।
তিনি বলেন, 'এটি দেখায় যে ইরান মনোযোগ দিচ্ছে, শিখছে এবং কীভাবে আমাদের আঘাত করা যায়, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।'
ভটেল আরও বলেন, ইরানের ড্রোন সক্ষমতা যথেষ্ট উন্নত এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচি দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫শ'টি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ খাইবার শেকান ছিল। তবে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় থাকা উপাদান ব্যবহার করে ইরান আরও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন তৈরির কারখানাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনজ।
হিনজের মতে, ইরান আগের উৎক্ষেপণগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, 'প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার থেকেই কোনো না কোনো তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি হামলা ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার কার্যকর কৌশল সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে।'
কম খরচে বড় চ্যালেঞ্জ
'খাইবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচ প্রকাশ করেনি ইরান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক সস্তা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিরোধকারী ব্যবস্থার খরচ একেকটি সিস্টেম অনুযায়ী প্রায় ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া বেশিরভাগ 'খাইবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্র তারা ধ্বংস করেছে। তবে তেহরান দাবি করেছে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়সহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
/এআই