ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি দ্রুত পুনর্গঠন করছে ইরান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির অবকাঠামো ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত পুনর্গঠন করছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম ইরানের কানগাভার এলাকায় একটি কথিত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশমুখ ও সংলগ্ন সড়ক বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মার্চে ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে সেই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেলেও, কয়েক সপ্তাহ পর এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে নতুন করে খনন করা সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ এবং পুনর্নির্মিত পাকা সড়ক দেখা যায়।
আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করে ডব্লিউএসজে জানায়, ইসরায়েলের এক সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি সেতু কয়েক দিনের মধ্যেই মেরামত করতে সক্ষম হয় ইরান।
এদিকে, জুলাইয়ের শুরুতে ধারণ করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী বন্দর শহর বান্দার আনজালির একটি জাহাজ নির্মাণ কারখানায় আংশিক পুনর্গঠনের কাজও দেখা গেছে। ওই স্থাপনাটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনকি, চলতি বছরের মার্চে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তারা কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলে ইরানের বেশ কয়েকটি নৌ-লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ইরানের নৌবাহিনীর একটি বড় ঘাঁটি, যেখানে কয়েক ডজন জাহাজ ধ্বংস হওয়ার দাবি করা হয়।
ধ্বংস হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সাবমেরিনবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত চারটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ এবং একটি করভেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ।
আইডিএফের সাবেক বিমান প্রতিরক্ষা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রান কোখাভ বলেন, 'ইরান আবারও তাদের মজুত পূরণ করেছে। শিল্পায়ন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী।'
তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের জুনে, ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর যেভাবে ইরান দ্রুত অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কেবল ভূপৃষ্ঠের প্রবেশমুখ ধসে পড়েছিল। তবে ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি। ফলে প্রবেশপথ পুনরায় খনন করলেই সেসব স্থাপনা আবার ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের দেজফুল শহরের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েলি হামলার পর প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে ঘাঁটির প্রবেশমুখ মাটিচাপা পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে তিন মাস পর, এয়ারবাসের ধারণ করা চিত্রে একই স্থানে একাধিক সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ পুনরায় খননের কাজ চলতে দেখা গেছে।
পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহর আরেকটি সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রেও একই ধরনের পুনর্গঠনের কার্যক্রম দেখা গেছে। জুনের শুরুতে ধারণ করা ছবিতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ‘রোরিং লায়ন’-এর শুরুতে হামলার শিকার হওয়ার পরপরই সেখানে নির্মাণ ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে দেখা যায়।
ডব্লিউএসজে আরও জানায়, লন্ডনের কিংস কলেজের এক প্রতিবেদনের বরাতে তেহরানের কাছে অবস্থিত রাজা শিমি ইন্ডাস্ট্রিজেও আংশিক পুনর্গঠনের কার্যক্রম শনাক্ত করেছে প্ল্যানেট ল্যাবসের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র। প্রতিষ্ঠানটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, কার্বন ফাইবারের মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র উপাদান উৎপাদনের স্থাপনা পুনর্গঠন করতে ইরানের কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে তার মতে, স্বল্পমেয়াদে ব্যবহারের জন্য ইরান এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আগেই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় মজুত করে রাখতে পারে।
এদিকে, ডব্লিউএসজের সোমবারের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর, ইরান হাজার হাজার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ নাটাঞ্জের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গভীর ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত স্থাপনায় স্থানান্তর করেছে। এ তথ্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর এসব সেন্ট্রিফিউজ সেখানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ওই সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দেয় ‘মিডনাইট হ্যামার’।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি পাহাড়ের গভীর ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক হামলার মুখেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তেহরান।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নাটাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ওই কমপ্লেক্সের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দুটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
/এআই