×
Logo

আন্তর্জাতিক

সিএনএন'র বিশ্লেষণ

ইরানের পিক্যাক্স মাউন্টেন কী? কেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগ্রহের কেন্দ্রে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

ইরানের পিক্যাক্স মাউন্টেন কী? কেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগ্রহের কেন্দ্রে

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলা চালাবে। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ধারণা করা হয়, তেহরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের একটি অংশ এবং উন্নত সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ এই ভূগর্ভস্থে মজুত করে রেখেছে।

এর জবাবে তেহরান সতর্ক করে বলে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যেকোনো মার্কিন হামলাকে এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্প্রসারণ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে। পিক্যাক্স মাউন্টেন সম্পর্কে সিএনএন এর একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো। 

পিক্যাক্স মাউন্টেন কী?

পিক্যাক্স মাউন্টেন হলো ইরানের কেন্দ্রে ভূগর্ভের গভীরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনা। যা ইতোপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের প্রায় এক মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এই কারণে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এবং যেকোনো সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জন্য একটি কঠিন লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

২০২০ সালে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। সে সময় ইরান জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে এটিকে পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির সেন্ট্রিফিউজ সংযোজনের একটি ভবিষ্যৎ কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে। স্থাপনাটি মূলত রহস্যে আবৃত। এর কোনো নকশা জনসমক্ষে নেই, এবং বিশেষজ্ঞরা মূলত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করেই এ বিষয়ে ধারণা লাভ করেন। 

আইএসআইএস সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, এই চিত্রগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, এই স্থাপনাটিতে বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স, একটি বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য কংক্রিট দিয়ে মজবুত করা প্রবেশপথ রয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, স্থাপনাটির এখনো নির্মাণকাজ চলছে। গত এক বছরে এই প্রচেষ্টা আরও তীব্র হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পর নির্মাণকাজ বৃদ্ধি পেয়েছে। আক্রান্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমপ্লেক্স, যা পিক্যাক্স মাউন্টেন থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানিয়েছে, পিক্যাক্স সাইটে এই বর্ধিত তৎপরতার বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। ইরান সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করতে পারে, যেমনটা তারা জাতিসংঘকে জানিয়েছিল। তারা তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করতে পারে। অথবা তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি প্রধান উপাদান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য একটি গোপন স্থাপনা তৈরি করতে পারে।

সেখানে কি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে?

ইসরায়েলি গোয়েন্দারা মনে করে, গত জুনের হামলার পর ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের একাংশ এবং উন্নত সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজগুলো পিক্যাক্স মাউন্টেনে সরিয়ে নিয়েছে। 

সেই ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা —নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো—তে হামলা চালায় এবং পারমাণবিক গবেষণা ও উন্নয়নে জড়িত বেশ কয়েকজন শীর্ষ বিজ্ঞানীকে হত্যা করে। যুদ্ধের প্রায় শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র এই লড়াইয়ে যোগ দেয় এবং আরও অনেক শক্তিশালী বোমা দিয়ে সেই একই তিনটি স্থাপনায় হামলা চালায়। 

এই হামলায় ট্রাম্প দাবি করেন যে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউই পিক্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালায়নি।

পরবর্তীতে মার্কিন ও জাতিসংঘের গোয়েন্দা সংস্থা জানায় যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মাত্র কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েরই একটি যৌথ লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়—হয় ইরানকে তাদের প্রায় ১,০০০ পাউন্ড ওজনের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অপসারণ করতে বাধ্য করা, অথবা তাদের কাছ থেকে তা কেড়ে নেওয়া।

গত মঙ্গলবার ইরান তাদের উন্নত সেন্ট্রিফিউজগুলো পিক্যাক্স মাউন্টেনে সরিয়ে নিয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে, ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রতিবেদনগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন করে বলেন, আমাদের কাছে এর কোনো নথি নেই।

ইরান দাবি করে যে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ও রফতানির জন্য আরও তেল মুক্ত করতে দেশটি অতিরিক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।

এটি কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে?

এ বিষয়ে নানা মতামত রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়া স্ট্রিকার সিএনএন-কে বলেন, ইরান যাতে পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ তৈরি করতে না পারে এবং তার পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ হিসেবে থাকা হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজের নাগাল না পায় তা ঠেকাতে ট্রাম্পের উচিত পিক্যাক্স মাউন্টেন নিষ্ক্রিয় করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া।

যদিও স্থল অভিযান জটিল হবে, আইএসআইএস-এর প্রতিবেদনে আক্রমণের বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপনীয় এই স্থাপনাটির জন্য বায়ুচলাচল, তাপ সরবরাহ, শীতলীকরণ সরবরাহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কর্মীর প্রয়োজন হবে – যা সবই এমন দুর্বলতা তৈরি করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কাজে লাগাতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তবে, স্থাপনাটির মূল অংশ সম্ভবত মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের পারমাণবিক নীতি বিষয়ক কাজের সহকারী জেমস অ্যাকটন এক্স-এ পোস্ট করেছেন যে, পিক্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনায় প্রবেশ সুড়ঙ্গগুলো ধসিয়ে দেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান। অ্যাকটন বলেন, এটা পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার মতো কিছু নয়।

/এসআর 

Logo