আল জাজিরার প্রতিবেদন
ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আপত্তি, প্রতিরক্ষা বিল আটকে দিলেন ডেমোক্র্যাটরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা বিল আটকে দিয়েছেন মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিনেটে এ সংক্রান্ত ভোটাভুটিতে বিলটি নিয়ে বিতর্ক শুরুর প্রস্তাব ৫০-৪৬ ভোটে নাকচ হয়। ভোটাভুটি প্রায় পুরোপুরি দলীয় লাইনে বিভক্ত ছিল। ১০০ সদস্যের সিনেটে বিতর্ক শুরু করতে অন্তত ৬০ ভোটের প্রয়োজন হলেও রিপাবলিকানরা সেই সমর্থন জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়।
ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ) বা জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন বিলকে সাধারণত কংগ্রেসের অবশ্যই পাস হওয়া আইনগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এবারের বিলে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটের বড় একটি অংশ অনুমোদনের কথা ছিল। তবে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে বিলটির অগ্রযাত্রা আপাতত থেমে গেছে।
ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার সময় এমন একটি বিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে তারা পেন্টাগনের রেকর্ড পরিমাণ বাজেট এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও গভীর করার বিভিন্ন ধারারও বিরোধিতা করেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার, ভোটের আগে, দলীয় সদস্যদের বিলটির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, এই বিল ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসের কার্যকর তদারকি ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ‘অনুমতিপত্র’ হিসেবে কাজ করবে।
শুমার বলেন, ‘রিপাবলিকানরা চাইছে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা বিল নিয়ে সিনেটে আলোচনা হোক। অথচ বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা সংকট, ইরান যুদ্ধ উপেক্ষিত থাকুক। আমরা তা করতে পারি না।’
কংগ্রেসের বাইরেও বিলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ১৪টি নাগরিক অধিকার, পররাষ্ট্রনীতি ও যুদ্ধবিরোধী সংগঠনের একটি জোট। তাদের দাবি, সিনেটে এমন একটি সংশোধনী আনার সুযোগ নিশ্চিত না করে এনডিএএ এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়, যাতে ট্রাম্পের অনুমোদনহীন ইরান যুদ্ধের জন্য অর্থায়ন নিষিদ্ধ করা হয়।
এই জোটের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ), জে স্ট্রিট, কোডপিংক এবং উইন উইদাউট ওয়ার। তাদের বক্তব্য, যুদ্ধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কার্যকর করতে বাজেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত।
তবে ইরান যুদ্ধই বিলটির বিরোধিতার একমাত্র কারণ নয়। সিনেটে উত্থাপিত খসড়ায় এমন কয়েকটি ধারা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক এবং গোয়েন্দা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পথ খুলে দেবে। এসব ধারাও ডেমোক্র্যাটদের আপত্তির মুখে পড়েছে।
বিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনে একজন বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে, যিনি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয় করবেন। এর আওতায় যৌথভাবে অস্ত্র গবেষণা ও উৎপাদন এবং দুই দেশের সামরিক ব্যবস্থায় একে অপরের প্রযুক্তি সংযুক্ত করার বিষয়ও থাকবে।
এছাড়া প্রস্তাবিত আইনে ‘ডেটা ফিউশন’-এর কথাও উল্লেখ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্য অনুযায়ী, এর অর্থ হলো বিভিন্ন সেন্সর ও গোয়েন্দা উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
সংস্থাটির আশঙ্কা, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন গোয়েন্দা তথ্যও ব্যবহার করতে পারে, যা ইসরায়েল বিতর্কিত গণনজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে।
অন্যদিকে, ইন্টেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের একটি পৃথক ধারায়, যা সাধারণত এনডিএএর সঙ্গেই বিবেচনায় আসে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গত সপ্তাহে সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন, বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন, এড মার্কি, জেফ মার্কলি ও পিটার ওয়েলচসহ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর সহকর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে বিলটি নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার আহ্বান জানান।
চিঠিতে তারা লেখেন, ‘ডেমোক্র্যাট হিসেবে আমাদের এমন কোনো ভোট দেওয়া উচিত নয়, যা ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর চরমপন্থি সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ করে দেয়।’
ভোটের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ভ্যান হলেন বলেন, এই বিল পেন্টাগনের জন্য অস্বাভাবিকভাবে বড় বাজেট অনুমোদনের পথ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ‘অবৈধ’ ইরান যুদ্ধের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।
ইসরায়েলসংক্রান্ত ধারাগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব বিষয় খুব বেশি আলোচনায় আসেনি; নীরবে বিলের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইসরায়েল সরকার কী করছে, তা বিবেচনা না করেই কেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাহী বিভাগকে আরও বেশি গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির নির্দেশ দেবে?’
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই অবস্থান দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলটির সমর্থকদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
প্রসঙ্গত, রয়টার্সের জুন মাসে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৫৯ শতাংশ। চলতি বছরের মে মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ শতাংশে।
/এআই