হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ল তেলের দাম
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১৮ এএম
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার পর সোমবার (১৩ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের সেপ্টেম্বর সরবরাহের ফিউচার মূল্য সোমবার গ্রিনিচ সময় ভোর ৫টা পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছায়। গত ২২ জুনের পর এটিই সর্বোচ্চ দাম।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই সরু জলপথ দিয়ে শান্তিপূর্ণ সময়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়ে থাকে।
গতকাল রোববার (১২ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার সক্ষমতা কমাতে ইরানের ওপর কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে তারা। এর আগে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে শত শত হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পর নতুন এই অভিযানের কথা জানায় ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানি বাহিনী ‘স্পষ্টভাবে’ হামলা চালিয়েছে। এর জবাবেই মার্কিন বাহিনী এই অভিযান পরিচালনা করেছে বলে দাবি করা হয়।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, 'হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে নেই।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের অযৌক্তিক আগ্রাসন, হয়রানি, হুমকি ও একতরফা সিদ্ধান্তের মধ্যেও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা হবে।'
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রোববার ইরানি বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে জানা গেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের অবস্থানও আরও কঠোর হয়েছে। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত পথ ব্যবহার না করে কোনো জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করলে সেটি নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তার আওতায় থাকবে না।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, 'অনুমোদনহীন পথে চলাচলের কারণে যে কোনো ধরনের পরিণতির দায় জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং অধিনায়কের ওপর বর্তাবে।'
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আবারও কমে গেছে নৌ চলাচল।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয়টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। অথচ চলতি মাসের শুরুতে প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২২টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করছিল।
শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ৯টি জাহাজকে প্রণালিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে চারটি ছিল ইরানের পতাকাবাহী।
আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তেলের দাম ৭০ ডলারের ঘরে থাকার পূর্বাভাস
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী প্রাথমিক হামলার আগে যে দামে তেল বিক্রি হচ্ছিল, তার তুলনায় বর্তমানে তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেল বিশ্লেষক মুকেশ সাহদেভ মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের শেষ ভাগে অবস্থান করতে পারে।
তিনি বলেন, 'পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মাঝে মাঝে দাম ওঠানামা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনার কারণে শোধনাগারগুলো কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নেয়।'
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর যে প্রবণতা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেটিকে আরও জোরদার করতে পারে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার আইজি মার্কেটসের বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইপির মতে, বর্তমান অস্থিরতার মধ্যেও তেলের দাম আগের মতো অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, 'জুনে যুদ্ধপূর্ব অবস্থার দিকে তেলের দাম ফিরে এসেছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা সফল হবে—এমন আশাবাদ থেকে। কিন্তু গত সপ্তাহের উত্তেজনা দেখিয়েছে, সেই সমঝোতা কতটা ভঙ্গুর।'
তার মতে, স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকির কারণে তেলের দাম কিছুটা বাড়তি চাপের মধ্যে থাকবে। তবে চাহিদা ধীরগতিতে বাড়া, মজুত তেল বাজারে আসা এবং ওপেক প্লাসের উৎপাদন বাড়ানোর কারণে আগের মতো বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা কম।
এশিয়ার শেয়ারবাজারেও চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। সোমবার বড় ধরনের পতন দেখা গেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে।
জাপানের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ বিকেলের লেনদেনে ২ শতাংশের বেশি কমে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক নেমে যায় ৮ শতাংশের বেশি।
এছাড়া হংকংয়ের প্রধান সূচক হ্যাং সেং প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
/এআই