সিএনএনের প্রতিবেদন
পার্টি নয়, ভক্তিগানে মগ্ন জেন-জি: ভারতে ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ভজন ক্লাবিং’
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের বিশাল এক অনুষ্ঠানস্থলের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। অফিস শেষে আসা তরুণ-তরুণী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, এমনকি কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘ সারি। প্রবেশপথে কিউআর কোড স্ক্যান করে হাতে পরিয়ে দেয়া হচ্ছে ব্যান্ড। বন্ধুরা একসঙ্গে সেলফি তুলছেন, কেউ গল্পে মশগুল। বাইরে থেকে দৃশ্যটি দেখে যে কারও মনে হতে পারে, এটি কোনো জনপ্রিয় ডিজে কনসার্ট বা রাতভর চলা ক্লাব পার্টির আয়োজন।
কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই বদলে যায় পুরো চিত্র। ভেতরে নেই কোন সারাব-ডিজে পার্টি। আছে শুধু আধ্যাত্মিকতা ও বিনোদনের এক নতুন মিশ্রণ। তাহলে কি আছে ভেতরে?
জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন সবাই। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আলো ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা কাঁধে শিশুকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন অনুষ্ঠান শুরুর। হঠাৎ স্পিকারে ভেসে আসে শব্দ। না, গানের নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিমূলক সংগীত। আর এই ভজনেই মুহূর্তের মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
সুরের তালে তালে মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে পড়েন হাজারো মানুষ। করতালি, সমবেত কণ্ঠে ভজন, নাচ আর উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে পরিবেশ। তবে এখানে নেই মদ, মাদক কিংবা ধূমপানের কোনো স্থান। আয়োজকদের পক্ষ থেকেই অ্যালকোহল ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরাও সেটিকেই এই আয়োজনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখছেন।
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এমনই এক নতুন ধারা কিংবা ট্রেন্ড যেটির নাম—‘ভজন ক্লাবিং’। যেখানে রাতের ক্লাব সংস্কৃতির আবহ থাকলেও মূল আকর্ষণ ধর্মীয় ভক্তিগান, আধ্যাত্মিকতা এবং সমবেত আনন্দ।
পার্টির বদলে প্রার্থনায় খুঁজছেন আনন্দ
২৫ বছর বয়সী জিল ভিরা প্রথমবারের মতো এই আয়োজনে অংশ নেন। তার ভাষ্য, এটি কেবল একটি কনসার্ট নয়, বরং ঈশ্বরের আরও কাছাকাছি যাওয়ার এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
তিনি বলেন, সাধারণ কনসার্টে ধূমপান, ভ্যাপিং কিংবা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে সবাই বাটারমিল্ক পান করছেন। রসিকতা করে তিনি বলেন, 'এটাই ছিল আমার অ্যালকোহল।'
বিশ্বজুড়ে জেন-জি প্রজন্মের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদক ও অ্যালকোহল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যেমন 'সোবার কিউরিয়াস' অনুষ্ঠান কিংবা 'কফি রেভ' জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তেমনি ভারতে তারই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংস্করণ হয়ে উঠছে ভজন ক্লাবিং।
শতাব্দীপ্রাচীন ভজন, কিন্তু উপস্থাপনা একেবারে আধুনিক
ভজন অবশ্য নতুন কিছু নয়। শত শত বছর ধরে ভারতের মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে বিনামূল্যে পরিবেশিত হয়ে আসছে এই ভক্তিগান। নতুনত্ব এসেছে এর উপস্থাপনায়ও।
এখন বড় বড় অডিটোরিয়াম, টিকিট কেটে প্রবেশ, বিশাল এলইডি স্ক্রিন, স্মোক মেশিন, আলো-ছায়ার কারুকাজ এবং কনসার্টের মতো আধুনিক মঞ্চসজ্জায় পরিবেশিত হচ্ছে ভজন। ফলে ধর্মীয় সংগীতও নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয়।
২৬ বছর বয়সী ধ্বনি পারাডিয়া বলেন, 'স্মোক ইফেক্ট, আগুনের ঝলক, সঙ্গীতের বিট; এসবই আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে মিলে যায়।'
তার ছোট বোন ফিওনি পারাডিয়ার মতে, পুরো মঞ্চসজ্জা অনেকটাই টেকনো কনসার্টের মতো হওয়ায় জেন-জি প্রজন্ম সহজেই এর সঙ্গে সংযোগ অনুভব করছে।
জেন-জির ভাষায় ভজন পৌঁছে দিচ্ছেন দুই ভাইবোন
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যাকস্টেজ সিবলিংস নামে পরিচিত দুই ভাইবোন: রাঘব আগারওয়াল ও প্রাচি আগারওয়াল। ছোটবেলা থেকেই ভজন পরিবেশন করলেও এখন তারা আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণদের কাছে ভক্তিগান পৌঁছে দিচ্ছেন।
রাঘবের ভাষ্য, 'অ্যালকোহল আর ক্লাবিং এক বিষয় নয়। মদ্যপান মানে নেশাগ্রস্ত হওয়া, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।'
প্রাচি বলেন, 'এখানে দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু কিংবা জীবনসঙ্গী; সবাইকে নিয়েই আসা যায়।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের নজর
এই আয়োজন এখন শুধু অনুষ্ঠানস্থলেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভজন ক্লাবিংয়ের ভিডিও কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে। কনসার্টের আলোর নিচে হাজারো মানুষের সমবেত ভজন, অচেনা মানুষকে জড়িয়ে ধরা, খালি পায়ে নাচ কিংবা আবেগে কান্নার দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এভাবে ধর্মীয় আচারকে কনসার্টে রূপ দেয়ায় আধ্যাত্মিকতা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে পারে।
ধর্ম-রাজনীতি-ব্যবসার সংযোগ
ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির বাজার ২০২৫ সালে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী দশকে এর আরও সম্প্রসারণের পূর্বাভাস রয়েছে।
ভজন ক্লাবিংয়ের উত্থান এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ভারতে জনপরিসরে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীক আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। সমালোচকদের মতে, এতে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ কিছুটা আড়ালে চলে যাচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষায়, ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রেখেই জেন-জি প্রজন্ম এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে নিচ্ছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
মানসিক চাপ থেকে স্বস্তির খোঁজ
'সনাতন জার্নি' প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন নিকুঞ্জ গুপ্ত। তিনি জানান, অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সদ্য চাকরিজীবনে প্রবেশ করা তরুণ কিংবা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা মানুষ।
তার ভাষায়, 'এখনকার তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ অনেক বেড়েছে। এখানে এলে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি অনুভব করেন।'
বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত। দেশটির মানুষের গড় বয়স মাত্র ২৯ বছর। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে অনেক তরুণ মানসিক চাপে ভুগছেন। সেই বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভজন ক্লাবিং তাদের কাছে হয়ে উঠছে এক ভিন্নধর্মী আশ্রয়: যেখানে আছে সংগীত, সমবেত উচ্ছ্বাস, আধ্যাত্মিক অনুভূতি এবং একাত্মতার স্বাদ।
মুম্বাইয়ের পাশাপাশি দিল্লি ও বেঙ্গালুরুতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই আয়োজন। এমনকি অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে।
আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্ত বলেন, 'এখান থেকে মানুষ চাপ বা হ্যাংওভার নিয়ে নয়, বরং প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সম্ভবত এ কারণেই দিন দিন আরও বেশি তরুণ এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।'
/এআই