ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট, ভেস্তে গেল ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১০ এএম
জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) বাতিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এক ঐতিহাসিক রায়ে আদালত জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু তাদের বাবা-মায়ের অভিবাসন-অবস্থা যাই হোক না কেন, সংবিধান অনুযায়ী জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিক।
আদালতে ৬-৩ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে অবস্থানরত অভিভাবকের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুরাও সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে বাধা
ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করতে চেয়েছিলেন। তার প্রশাসনের যুক্তি ছিল, অবৈধ অভিবাসী বা অস্থায়ী ভিসাধারীদের সন্তানরা সংবিধানের ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের 'জুরিসডিকশনের' আওতাভুক্ত নয়। তাই তাদের জন্ম সূত্রেই নাগরিকত্ব পাওয়া উচিত নয়।
তবে সুপ্রিম কোর্ট সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্বের অধিকার সংবিধানেই সুরক্ষিত।
রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, 'নাগরিকত্বের অধিকার যৌক্তিক। এটি একজন মানুষকে আমাদের সমাজের পূর্ণাঙ্গ অংশ হওয়ার সুযোগ দেয়। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য নিশ্চিত করেছিলেন। আজও আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।'
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, 'এটি খুবই দুঃখজনক সিদ্ধান্ত'।
তিনি জানান, আদালতের রায়ের পরও তিনি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য, 'এ জন্য দীর্ঘ ও জটিল সাংবিধানিক সংশোধনের প্রয়োজন নেই। কংগ্রেসের উচিত আজ থেকেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই ব্যয়বহুল এবং দেশের জন্য অন্যায্য ব্যবস্থা বাতিলের কাজ শুরু করা।'
১৫০ বছরের সাংবিধানিক নীতি
যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬৮ সাল থেকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কার্যকর রয়েছে। গৃহযুদ্ধের পর সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ১৪তম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির বিচারিক এখতিয়ারের আওতাভুক্ত সব ব্যক্তি মার্কিন নাগরিক।
পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়েও এই সাংবিধানিক অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তিন বিচারপতির ভিন্নমত
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির মধ্যে তিনজন—ক্লারেন্স থমাস, নিল গরসাচ ও স্যামুয়েল আলিটো: সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গে একমত হননি।
বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস মত দেন, ১৪তম সংশোধনীকে এর মূল উদ্দেশ্যের বাইরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আর বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো বলেন, এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই প্রায় সবাই নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবে, এমনকি যারা কেবল সন্তান জন্ম দিতে সাময়িকভাবে দেশটিতে আসেন, তারাও এর সুবিধা পাবেন।
মানবাধিকার সংগঠনের স্বাগত
রায়কে স্বাগত জানিয়েছে অভিবাসী অধিকার ও নাগরিক অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফরিজ বলেন, 'সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আবারও নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সব মানুষই মার্কিন নাগরিক। এ বিষয়ে আর কোনো সংশয়ের সুযোগ নেই।'
অন্যদিকে লইয়ার্স কমিটি ফর সিভিল রাইটস আন্ডার ল'এর প্রধান আইনজীবী দারিয়েলি রদ্রিগেজ বলেন, এই রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত সাংবিধানিক নীতিকেই পুনর্ব্যক্ত করেছে। তার ভাষ্য, 'যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক শিশু, তার বাবা-মায়ের আইনি অবস্থান যাই হোক না কেন, জন্মসূত্রেই মার্কিন নাগরিক।'
এই রায়কে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক নীতিকে আরও একবার সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করল।
/এআই