×
Logo

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম টানতে মার্কিন সিনেটে বিল পাস: বিবিসি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম টানতে মার্কিন সিনেটে বিল পাস: বিবিসি

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে একটি যুদ্ধক্ষমতা (ওয়ার পাওয়ারস) প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন সিনেট। 

প্রস্তাব অনুযায়ী, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সিনেটে '৫০-৪৮' ভোটে বিলটি পাস হয়। এর আগে, চলতি মাসের শুরুতে, প্রতিনিধি পরিষদেও প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়। যদিও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তবুও চারজন রিপাবলিকান সিনেটর দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন। ফলে প্রথমবারের মতো কোনো ওয়ার পাওয়ারস প্রস্তাব কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই পাস হলো।

তবে এই সাফল্য আপাতত প্রতীকীই থেকে যেতে পারে। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিলটিতে ভেটো দেবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

দলীয় বিভাজন ভেঙে ভোট

প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়া রিপাবলিকান সিনেটররা হলেন লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি, আলাস্কার লিসা মারকাউস্কি, মেইনের সুসান কলিন্স এবং কেন্টাকির র‍্যান্ড পল। অন্যদিকে, রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল ও ডেভ ম্যাককরমিক ভোটদানে অংশ-ই নেননি।

ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে কেবল পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান রিপাবলিকানদের অবস্থানকে সমর্থন করেন।

সিনেটে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সামরিক নীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সিনেটে এটি ছিল দশম ওয়ার পাওয়ারস প্রস্তাব।

তার ভাষ্য, 'বছরের পর বছর ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি আমেরিকান জনগণকে উপহার দিয়েছেন বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং ব্যয়বহুল একটি যুদ্ধ এবং লাঞ্ছনা।'

শুমার আরও অভিযোগ করেন, অধিকাংশ রিপাবলিকান সিনেটর বারবার জনগণের পরিবর্তে ট্রাম্পের পক্ষ নিয়েছেন। তার দাবি, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।

যুদ্ধ ও বিতর্কের পটভূমি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামের সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

এটি ছিল দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের দ্বিতীয় বড় সামরিক পদক্ষেপ। এর আগে, ২০২৫ সালের জুনে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মার্কিন বোমারু বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এসব সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যদিও তেহরান দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সমালোচকদের মতে, ফেব্রুয়ারির হামলা ছিল উসকানিবিহীন আগ্রাসন, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়েছে।

আলোচনা চলমান, তবুও অনিশ্চয়তা

বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। গত ১৭ জুন, স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে দুই পক্ষ আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।

তবে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল এরই মধ্যে লেবাননে নতুন হামলা চালিয়েছে, যা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক রিপাবলিকান সিনেটর যুক্তি দেন, ওয়ার পাওয়ারস প্রস্তাবটি পাস হলে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

আইডাহোর রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ বলেন, 'এই প্রস্তাব পাস হলে ইরান আলোচনার টেবিল ছেড়ে চলে যেতে পারে। তারা বলবে, কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে বলে দিয়েছে আমাদের একা ছেড়ে দিতে।'

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প ভেটো দিলে প্রস্তাবটির কার্যকারিতা থাকবে না বললেই চলে।

জনমত ও রাজনৈতিক চাপ

তবে বিলটির পাস হওয়া কংগ্রেসে ট্রাম্পের সামরিক নীতির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধ শুরু থেকেই অজনপ্রিয়। এই যুদ্ধের জেরে ট্রাম্প তার নিজ দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্স-ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যুদ্ধটি এর ব্যয়ের তুলনায় যৌক্তিক ছিল।

এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও ভোটারদের চাপের মুখে রয়েছেন। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।

সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা করার একচ্ছত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের। তবে গত কয়েক দশকে দেশটির বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট বিদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করায় সেই ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে, কংগ্রেসের প্রভাব তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। 

ট্রাম্পও কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে বলেছেন, অতীতের নজির অনুযায়ী সামরিক পদক্ষেপ নিতে তার কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।

গত সপ্তাহে, এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে ইরান যুদ্ধ থেকে কোনো শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন হয়নি। তার ভাষায়, 'কোনো সীমা নেই'।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন বলেন, যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নয়, কংগ্রেসের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই ক্ষমতা আইনসভাকে দিয়েছিলেন, যাতে একজন ব্যক্তির হাতে যুদ্ধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীভূত 'না' হয়।

তিনি ও চাক শুমার দুজনই জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আনতে ভবিষ্যতেও তারা একই ধরনের আইন প্রণয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

শুমারের ভাষ্য, 'ট্রাম্প কংগ্রেসকে ব্রিফ করছেন না, নিজের চুক্তির ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন না, যুদ্ধও শেষ করছেন না। কিন্তু কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।'

/এআই 

Logo