×
Logo

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে ফাটল ধরছে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে ফাটল ধরছে

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই অস্থিতিশীল করেনি বরং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কেও দৃশ্যমান ফাটল তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতার মধ্যে এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) এক অ্যানালাইসিসে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

হোয়াইট হাউসে একসময় নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ট্রাম্পও প্রকাশ্যে তার প্রশংসা করতেন। তবে সাম্প্রতিক ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কের উষ্ণতা কমে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ট্রাম্প এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন এবং অভিযোগ তোলেন যে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত ইরানের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে।

গত রোববার (৭ জুন) বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি হামলার পর ইরান উত্তর ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। দুই মাস আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল এই হামলার মাধ্যমে তা কার্যত হুমকির মুখে পড়ে।

ট্রাম্প এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই। নেতানিয়াহু সিদ্ধান্ত নেয় 'না'।

যদিও পরবর্তীতে উভয় পক্ষই হামলা বন্ধ করেছে তবুও এই ঘটনা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প দ্রুত একটি কূটনৈতিক সমাধান চান।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। ইসরায়েলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক ইসরায়েলি নাগরিক এই অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইরান যখন হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে, ওয়াশিংটন প্রতি বছর, প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা প্রদান করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সমর্থন ও উন্নত অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের প্রধান ভরসা।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সাংবাদিক গিদিওন লেভি বলেন, ইসরায়েল ট্রাম্পকে 'না' বলার অবস্থানে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

নেতানিয়াহু বর্তমানে দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোতে। অন্যদিকে, তার ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনায় ইসরায়েলের কোনো সরাসরি অংশগ্রহণ নেই। সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের সরকার বহাল রাখা এবং সীমিত আকারে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। এমন কোনো চুক্তি হলে তা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রকাশ্য মতবিরোধকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বড় ধরনের বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাদের ভাষ্য, ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলকে বিপুল সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে কথার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের বড় ধরনের পার্থক্য রয়ে গেছে। এই সম্পর্কের মধ্যে কিছু টানাপোড়েন দেখা গেলেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখনো অটুট রয়েছে।

/এওয়াইএ/এআই

Logo