কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি আধুনিক স্টেডিয়াম জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৪৮টি দেশের ১,২৪৮ জন বিশ্বমানের ফুটবলারের ১০৪ ম্যাচের জমকালো লড়াই শেষে অবশেষে পর্দা নামল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকায় ৮৩ হাজারের বেশি গ্যালারিভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের মধ্য দিয়ে যে বিশ্বযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটল নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ঘাসে।
গ্রুপ পর্বে উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ২-০ গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শুভসূচনা করে, যেখানে আসরের প্রথম গোলটি করেন জুলিয়ান কুইনোনেস এবং জয় নিশ্চিত করেন রাউল হিমেনেজ।

প্রথম ম্যাচে মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী ম্যাচে আয়োজক মেক্সিকো ২–০ গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাজিত করে। মেক্সিকোর রোবের্তো আলভারাদো প্রথম গোলের পাস প্রথম অ্যাসিস্ট যোগান। প্রথম ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বা জোয়ানে।
প্রথম ম্যাচের মূল রেফারি ছিলেন ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞ রেফারি হেসুস ভ্যালেনজুয়েলা উদ্বোধনী ম্যাচটি পরিচালনা করেন। প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন প্রথম ম্যাচের ৪৯ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার স্পেফেলো সিথোল। প্রথম লাল কার্ড দেখেন প্যারাগুয়ে বনাম তুরস্কের ম্যাচে প্যারাগুয়ের মিগুয়েল আলমিরন। প্রথম হ্যাটট্রিক করেন গ্রুপ পর্বে নরওয়ের স্ট্রাইকার আরলিং হাল্যান্ড। বিশ্বকাপে মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হয়। তার মধ্যে মোট গোল ৩০৮টি। ম্যাচ প্রতি গড় ২.৯৬টি।

বিশ্বকাপে এই আসরে নকআউট পর্ব শুরু হয় রাউন্ড অব থার্টি টু। শেষ আটে ফ্রান্স, মরক্কো, স্পেন, বেলজিয়াম, নরওয়ে, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড জায়গা করে নেয়। সেমিফাইনালে স্পেন ২-০ গোলে ফ্রান্সকে চূর্ণ করে এবং আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচের ভাগ্য। ইনজুরি টাইমে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এঞ্জো ফার্নান্দেজ মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় তারা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১০৬তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামা স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ফেররান তোরেস দূরপাল্লার এক দর্শনীয় গোলেই স্পেনের জয় নিশ্চিত করেন। এই এক গোলের লিড শেষ পর্যন্ত ধরে রেখে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দীর্ঘ ১৪ বছর পর নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের পর এটিই লা রোখাদের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বমুকুট।

টুর্নামেন্টের শীর্ষ ব্যক্তিগত পুরষ্কারগুলোতেও ছিল স্প্যানিশ ও ফরাসি তারকাদের আধিপত্য। পুরো আসর জুড়ে চোখধাঁধানো ১০টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ নিজের নামে করেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই টুর্নামেন্টেই তিনি লিওনেল মেসির ২১ গোলের অলটাইম রেকর্ড পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ ২২ গোলের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তালিকায় ৮টি গোল করে ২য় স্থানে ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবং ৭টি করে গোল করে যৌথভাবে ৩য় স্থানে অবস্থান করছেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম ও নরওয়ের আর্লিং হাল্যান্ড।

স্পেনের মিডফিল্ডের প্রাণ রদ্রি জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’। এছাড়া স্প্যানিশ দেয়াল উনাই সিমোন টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ অর্জন করেন এবং স্পেনের ১৭ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসির হাতে উঠেছে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের ট্রফি। ফিফা ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড পায় নেদারল্যান্ডস।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শিরোপা জিতেছে স্পেন, যা স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। টুর্নামেন্টের রানার্স-আপ তথা ২য় স্থান অর্জন করে আর্জেন্টিনা, আর আগের রাতে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত ৩য় স্থান নির্ধারণী ক্লাসিক ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ৩য় স্থান অর্থাৎ ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে পরাজিত হয়ে ৪র্থ স্থান নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করে ফ্রান্স।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মেগা আসরের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত বহু সঙ্গীতশিল্পী ও তারকা পারফর্ম করে দর্শক মাতিয়েছেন। ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা অনুষ্ঠিত জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল আকর্ষণ ছিলেন কলম্বিয়ান পপ কুইন শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান আফ্রোবিটস তারকা বার্না বয়, যারা টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল গান 'ডাই ডাই' প্রথমবার সরাসরি পরিবেশন করেন। এছাড়া উদ্বোধনী পর্বে জে বালভিন, তাইলা, ড্যানি ওশান, বেলিন্ডা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উদ্বোধনী পর্বগুলোতে কেটি পেরি, ব্ল্যাকপিঙ্কের লিসা, আদেল ফিউচার, আনিতা ও মাইকেল বুবলে গান পরিবেশন করেন।

অন্যদিকে, ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচের আগে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপান ব্রিটিশ পপ আইকন রবি উইলিয়ামস , ইতালিয়ান গায়িকা লাউরা পাউসিনি, নিকোল শেরজিঙ্গার এবং জনপ্রিয় ইন্টারনেট ইউটিউবার আইশোস্পিড , যার সাথে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন হলিউড মেগাস্টার টম ক্রুজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন অস্কার ও গ্র্যামি জয়ী জেনেনিফার হাডসন ; তাছাড়াও ফাইনালের ঐতিহাসিক হাফ-টাইম শোতে শাকিরা, বিটিএস, মাডোনা ও জাস্টিন বিবার পারফর্ম করেন।
ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যেন কেবল একটি বিশ্বকাপের যবনিকাপাত ঘটেনি, বরং অবসান ঘটেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মহাকাব্যিক এক সোনালী অধ্যায়ের। শেষবারের মতো মাঠের ঘাস ছুঁয়ে দেখা, গ্যালারির অগণিত চোখের জলের জবাব হাত নেড়ে দেওয়া এবং বুকভরা দীর্ঘশ্বাসে বিদায় জানানোর এই প্রতিটি মুহূর্ত ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। জয়ের সীমানা পেরিয়ে, রেকর্ড বইয়ের পাতার বাইরে গিয়েও এই বিদায়ী তারকাদের পদচিহ্ন বিশ্বমঞ্চে রেখে গেল এক চিরন্তন রূপকথা, যা আগামী বহু প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে যাবে।
/এএ