×
Logo

খেলাধুলা

টানা ২ বিশ্বকাপে ব্যর্থতায় ঘায়েল, তবুও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য ত্রাস 'জার্মানি'

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

টানা ২ বিশ্বকাপে ব্যর্থতায় ঘায়েল, তবুও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য ত্রাস 'জার্মানি'

২০১৪ ওয়ার্ল্ড কাপ। সবার কাছে ফেভারিট 'ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা'। নেইমার-মেসি বন্দনায় বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ফুটবল প্রেমীরা। তুলনামূলকভাবে, ব্রাজিলের পাল্লা একটু ভারী ছিলো, কারণ তারাই 'হোস্ট' ন্যাশন। আন্টিল সিরিয়াস 'জার্মান মেশিনস' এন্টার ইনটু দ্য গেইম।

'১৪ ওয়ার্ল্ড কাপের 'গ্রুপ সি'র ম্যাচে পর্তুগাল অনেকটা ফুরফুরে। কারণ—তাদের কাছে রয়েছে সিআর-৭। কিন্তু ম্যাচের প্রথমার্ধের মধ্যেই ৩ গোল। এরপর পর্তুগিজ ডিফেন্ডার পেপে মারামারি করে দলকে ১০ জনে পরিণত করলে আরও বিপদে পড়ে তারা। ওই ম্যাচে মুলার হ্যাট্রিক করেন। আর 'সিআর-৭' কিছুই করতে পারলেন না। ওই ম্যাচ দেখে অনেকের হয়তো আইডিয়া হয়ে যায়, '১৪'র বিশ্বকাপে জার্মানি তাণ্ডব চালাতে চলেছে।

আরেকটি 'এক্স-ফ্যাক্টর' হচ্ছে জার্মানি নিউ 'স্টাইল অব প্লে'। গোলকিপার ম্যানুয়াল নয়্যার চেঞ্জ করে ফেলেন ট্র্যাডিশনাল গোলকিপিং। এই যেমন, মাঝ মাঠে ঘুরে-ফিরে বেড়ানো, অ্যাটাক বন্ধ করা কিংবা নিজেই কাউন্টার-অ্যাটাক লিড করা। এমন খেলা এর আগে ফুটবল ভক্তরা আগে দেখেনি। অনেক বিশ্লেষকই, নয়্যারের প্রশংসা করতে গিয়ে হেসে দিয়েছেন, কারণ তিনি গোলপোস্টে থাকতেন-ই না। ডি-বক্স কি জিনিস তিনি জানেনই না।

অন্যদিকে, মুলার-ওজিল-টনি ক্রুস-সামি কাদিরা এমন গতিময় আর পাসিং ফুটবল উপহার দিয়ে যাচ্ছিলেন, যা দেখে যেকোনো দলই দোয়া করছিলো জার্মানদের সাথে যাতে খেলা না পড়ে। 

'১৪ বিশ্বকাপে জার্মান টিমের প্রত্যেকটি প্লেয়ার নিজ-নিজ পজিশনে খেলেছেন দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে শুধুমাত্র ঘানা দিয়েছিলো ২ গোল। তবে, জার্মানরাও দিয়েছে ২ গোল। ওই ম্যাচে সুপার মারিও হাঁটু দিয়ে একটি গোল করেছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একটি মাত্র গোল করে জিতে জার্মানরা। জয়ের নায়ক আবার মুলার। 

এরপর 'লাস্ট-১৬'এ আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করেন আন্দ্রে শুরলে। আর জয়সূচক আরেকটি গোল করেন ওজিল। তবে, ২টি প্লেয়ারদের নাম না বললেই নয়- বাস্টিয়ান শোয়েনস্টাইগার ও মিরোস্লাভ ক্লোসা। 

কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স। তবে টনি ক্রুসের ম্যাজিকাল ফ্রি-কিক থেকে জয়সূচক একমাত্র গোল করেন ডিফেন্ডার ম্যাটস হামেলস। 

৮ জুলাই, ২০১৪। বেলো হরিজেন্তের 'মিনেইরো স্টেডিয়াম' লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। স্বাগতিক হিসেবে ‘হট ফেভারিট’ ব্রাজিল। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ জার্মানি। ম্যাচের আগে সবাই ধরেই নিয়েছে জার্মানদের উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে যাবে ব্রাজিল। তবে কে জানতো, সেই দিন ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম বিভীষিকাময় দিন হতে চলেছে। সেই ম্যাচে ক্লোসা, মুলার, ক্রুস এবং ওজিল; সবাই মিলে যেনো ব্রাজিলের সাথে মশকরা করছিলো। পাসিং ফুটবল দলগতভাবে কীভাবে খেলতে হয়, সেটাই যেন ব্রাজিলকে শেখাচ্ছিল জার্মানরা। ৯০ মিনিটের খেলা শেষে ম্যাচের স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৭-১। 

ম্যাচের শেষে জার্মানরা সেলেসাওদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলো, চেষ্টা করছিলো ব্রাজিল খেলোয়ারদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য। তবে, হার আর অপমানের হার নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে স্টেডিয়ামের মাঠ ত্যাগ করে সেলেসাওরা।

২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির জয়টি ছিল সর্বকালের সবচেয়ে বড় জয়। আর এই ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন 'অস্কার', যা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য ওই হারের বেদনাদায়ক স্মৃতি ভুলতে পর্যাপ্ত নয়। অন্তত, এখন পর্যন্ত না! 

এরপর থেকে আর্জেন্টিইন সমর্থকরা ফাইনালের আগ পর্যন্ত ব্রাজিল সাপোর্টাদের একটি মজাই নিতেন। কি হবে নাকি ৭-আপ? আর্জেন্টিনার ভক্তরা একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তাদের দলে 'ফুটবল গড' রয়েছে। কথা সত্যি! মেসি তখন প্রাইমে। ইন ফ্যাক্ট বয়স অনেক হলেও, যেকোনো খেলা চোখের পলকে চেঞ্জ কেউ করতে পারলে শুধু একজনই পারবেন। লিও-১০।

কিন্তু ২০১৪ ওয়ার্ল্ড কাপ 'বিলংগস টু দ্য জার্মান'স। ফাইনালে আর্জেন্টাইন গনসালো হিগুয়াইন একটি গিফটেড পাস পেয়েও গোল করতে পারেননি। এরপর আর সুযোগ দেয়নি জার্মানি। শেষে ১১৪ মিনিটে সুপার মারিও গোল করে জার্মানদের এনে দেয় শিরোপা। 

ম্যাচ হেরে ব্রাজিল সমর্থকদের মজা নেওয়া শুরু। তবে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের 'লজিক', 'তোমাদের মতো ৭ গোল খাইনি। একগোলে হেরেছি।' 

এরপর ২০১৮ ও ২০২২ সালে জার্মানদের বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স ছিলো যা-তা। বাজে ডিফেন্স-অ্যাটাক সব মিলিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। তবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ নিজেদের জন্য 'স্যালভেশন'। অনেকটা ১৯৯৪-এর সিনেমা 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন'-এর ওয়ার্ডেন নরটনের ডায়লগ, 'স্যালভেশন লাইজ উইদিন' মানে পরিত্রাণ কিংবা মুক্তি নিজের মাঝেই নিহিত। জার্মানদের এই বাজে ফুটবল থেকে তাদের নিজেদেরই বেরিয়ে আসতে হবে।

২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াড

এবারের জার্মান টিমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্ধুতে রয়েছেন কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান। তিনি ২৮ বছর বয়স থেকে সিরিয়াসলি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেন। হফেনহাইম, আরবি লাইপজিগের মতো টিমকে বুন্দেসলিগায় লিড করে হয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের কোচ। এরপর জোয়াকিম লো'-হান্সি ফ্লিকের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন ডয়েচল্যান্ডের। তিনি কেমন আগ্রাসী কোচ, তা ওয়ার্ল্ড কাপে জার্মানদের খেলার মধ্যেই দেখা যাবে। এছাড়াও দলে চমক দিয়ে আবার জায়গা পেয়েছেন জার্মান ওয়াল ম্যানুয়াল নয়্যার। তবে ৪০ বছর বয়সে কীভাবে দলে জায়গা পেলেন, সেটি জানতে হলে দেখতে হবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২০২৫/২৬-এর সেমিফাইনাল ম্যাচ। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফরাসি ক্লাব পিএসজিকে একাই নাকানিচুবানি খাইয়েছেন তিনি।

তবে দলের নেতৃত্ব দেবেন আরেক বায়ার্ন ডিফেন্সকাম- মিডফিল্ডার জশুয়া কিমিচ। এছাড়াও মাদ্রিদ স্টার রুডিগার, জনাথান টাহ, ডেভিড রাউমের মতো প্লেয়ারতো আছেন-ই। 

কিন্তু দেখার মতো প্লেয়ার ফ্লোরিয়ান উইর্টজ, যিনি লিভারপুলের মিডফিল্ডার। অনেকেই বলেন, টনি ক্রুসের ব্লাড তার ভেতরে। তবে, টনির থেকেও আরও বিধ্বংসী। এছাড়াও রয়েছেন ইয়াং মেশিন জামাল মুসিয়ালা। তিনিও বাভারিয়ানদের দলে খেলেন।  এছাড়াও লিরয় সানে, কাই হাভার্টজ, ওলটাম্যাডে, গোরেজকারাও আছেন। 

জার্মানির গ্রুপও তুলনামূলক সহজ। গ্রুপ ‘ই’-তে তাদের প্রতিপক্ষ কুরাসাও, আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর। কাগজে-কলমে নকআউট পর্বে ওঠার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কোনো দলকেই হালকাভাবে নিতে চাইছে না জার্মানি।

জার্মান দল দেখে কেউ যদি মনে করে থাকে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল টিম কিংবা সেমিফাইনাল পর্যন্তই দৌড়, তাহলে ভুল হবে, কারণ, দলটির প্ল্যান কিংবা এবারে তাদের খেলার ধরন কেমন হবে,  কেউ জানে না। তাই ব্রাজিল কিংবা রেইনিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য ত্রাসের আরেক নাম হতে পারে জার্মানি। 

অথবা বলা যায়, নেভার আন্ডার এস্টিমেট দ্য জার্মানস, এভার!

/এআই 


Logo