পারভীন শাকিরের জন্মদিন
পারভীন শাকির সেই খুশবু, যা আজও অমলিন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৪১ পিএম
মুনিম রাব্বী
মুশায়রার মঞ্চ। নিস্তব্ধ শ্রোতা। এক দীপ্তিময়ী নারী হাতে মাইক্রোফোন তুলে নিলো। দুই এক স্তবক পড়তে পড়তেই খুশবুতে ভরে উঠলো পুরো হলরুম। এই সুগন্ধি তার কবিতার। শব্দ আর চোখের ইশারার। মুচকি হাসিতে শায়েরার প্রেম, অভিমান আর দুঃখবিলাসে বুঁদ হয়ে যতো কবিতার মেহফিল।
তিনি পারভীন শাকির। উর্দু সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নাম। পারভীন শাকিরের জন্ম হয়েছিল আজকের দিনে, বায়ান্ন সালের ২৪ নভেম্বর। বর্ষণসিক্ত করাচিতে। সেদিনের বৃষ্টির মতো তার জীবনও ছিল আবেগ আর সংঘাতের জলছাপ মেশানো। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠিন্যে বড় হয়ে ওঠা পারভীন মনে করতেন, শুধু একজন নারী হয়ে থাকার চেয়ে তার কাছে কবি হয়ে ওঠা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বিশ্বাসই তাকে উর্দু কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে।
চব্বিশ বছর বয়সে পারভীন কবিতার জগতে পা রাখেন। প্রথম বইটি যখন লেখেন, তখনও বিয়ে করেননি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘খুশবু’তে তার সেই স্বাধীনতার চঞ্চল উচ্ছ্বাস বিদ্যমান। সুগন্ধ বলে দিচ্ছে, সে এই পথেই আছে, বাতাসের তরঙ্গের কাছে আছে তার খোঁজ।
কিন্তু পরবর্তী বইগুলোতে তার জীবনের বদলের বাঁক ফুটে ওঠে। তিনি পাকিস্তানের বহু নারীর মতো একইরকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। একটি অসম বিবাহ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য যার শেষ হয় বিবাহবিচ্ছেদে।
একটা সময় শাকির এই বিশ্বাসে উপনীত হন যে, তিনি নিজের পরিবার বা শ্বশুরবাড়ি থেকে সবার সমর্থন পাননি। বিশেষ করে কবিতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ কেউ বুঝতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, একজন উজ্জ্বল কবি হিসেবে তার খ্যাতিও তাকে সর্বব্যাপী পিতৃতন্ত্র থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

এমন নয় যে, উর্দু সাহিত্যে তিনিই প্রথম নারী, যিনি কবিতার ময়দান দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। উর্দু কবিতার ইতিহাসে সব যুগেই নারী কবিদের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু পারভীনের বিশেষত্ব হলো, তিনি সেই অগ্রবর্তী দলের প্রধান, যিনি নারীর অনুভূতিকে নারীর ভাষায় বলতে পেরেছেন।
গজল হলো উর্দু কবিতার সেই শাখা, যেটা সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়। এই শাখায় নতুন বা একেবারে ভিন্ন ধরনের কোনো ভাবনা তুলে ধরা এমনিতেই খুব কঠিন। কারণ, বড় বড় কবিরা প্রায় সবকিছুই লিখে গেছেন। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য নতুন কিছু তুলে আনা ছিল কঠিন। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মতো প্রখ্যাত কবিও একই কথা মনে করতেন। যে কারণে ফয়েজ বা ইকবালের মতো কবিরা গজলের চেয়েও বেশি নজর কেড়েছেন নজম বা দীর্ঘ কবিতার জন্য। পারভীন শাকির সেই চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রচুর নজম বা কবিতা লিখেছেন। এই নজমগুলোর গড়ন ও আঙ্গিক এমন যে এদেরকে 'নসরি নজম' বা গদ্য কবিতা বলা চলে। সাধারণত গদ্য কবিতায় কোনো বাঁধাধরা ছন্দ থাকে না কিন্তু পারভীনের নজমে সেই ছন্দও খুঁজে পাওয়া যায়। তার কবিতায় শুধু ছন্দ নয়; গানের মতো গীতিময়তা, চিন্তার নতুনত্ব এবং শব্দের জাদুময় ব্যবহার ছিল। তার প্রথম সংকলন খুশবু এবং শেষ সংকলন ইনকার পর্যন্ত শাকির এই জাদু ধরে রাখতে পেরেছেন সমানভাবে।
পারভীন শাকিরি কবি। কবিতার বিস্তৃত বিদগ্ধ গহবর ছাপিয়ে তার নারীত্ব নানা রুপে ফুটে উঠেছে কবিতায়। বিচ্ছেদে, বিরহে, একাকীত্বে অন্তরীণ পারভীন সেই নারীত্বকে কখনও মরে যেতে দেননি। বিবাহ বিচ্ছেদের অনলে পুড়ে তিনি তাই লিখেছিলেন—
‘বাতাস, তার রাতের কিছু খবরও শোনাও। সে কি আজ নিজের ছাদে একা ছিল? নাকি আমার মতো কোনো সাথী ছিল? সে কি চাঁদ দেখে তার মুখ দেখেছিল?’
‘আমি পাতায়-পাতায় তাকে বাড়তে দিতে থাকলাম, আর সে ডালে-ডালে আমার মূল কাটতে থাকল।’

এমন নয় যে, পারভীন কেবল প্রেম ও রোম্যান্সকেই তার কবিতার বিষয় করেছেন। তিনি তার নিজের মাটি এবং তার সাথে যুক্ত সমস্যাও কলমবন্দ করেছেন। 'ফারজান্দ-এ-জমিন' (পৃথিবীর সন্তান), 'শাহজাদি কা আলমিয়া' (রাজকুমারীর ট্র্যাজেডি) এবং 'বাহার আভি বাহার পর হ্যায়' (বসন্ত এখনও বসন্তেই আছে)-এর মতো কবিতাও লিখেছেন, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়বস্তু নিয়ে। কিন্তু সেগুলোর প্রভাব ও মর্মস্পর্শিতা তার রোম্যান্টিক নজমগুলোর চেয়ে বেশ কম।
পারভীন শাকিরের আরেকটি বিষয় হলো, তিনি তার মনোবেদনাকে সার্বজনীন করে তুলতে পেরেছিলেন। এমন এক দুঃখকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, যা প্রতিটি নারীর মধ্যেই উপস্থিত থাকতে পারে। ‘আমি তার আয়ত্তের মধ্যেই আছি, কিন্তু সে আমার থেকেই আমার সম্মতি নিয়ে চায়।’
শাকিরের সুস্থির নারীত্ব, অকপটতা এবং নির্জনতা তাকে আকর্ষণীয় রহস্যময় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। উর্দু কবিতার প্রেমিক হয় তীব্র আবেগপ্রবণ, যা মাঝেমাঝেই মাডলিন বা অতি-আবেগের সীমা অতিক্রম করে যায়। এই প্রেমের মধ্যে শাকির নিয়ে এসেছিলেন এক প্রগলভ নারীসুলভ শব্দবন্ধ, যা তার আগের প্রজন্মের নারীদের তুলনায় অনেক বেশি অন্তরঙ্গ ও সোজাসাপ্টা।
‘তোমার জীবনে আমি কোথায়? সকালের বাতাসে নাকি সন্ধ্যার তারায়, দ্বিধান্বিত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে নাকি তীব্র বর্ষণে, রুপালি চাঁদের আলোয় নাকি প্রখর দুপুরে, গভীর চিন্তায় নাকি নৈমিত্তিক সুরে?’
অথবা ‘এখন সে অন্যের সাথে আছে, তো কীসের বেদনা? সে আগেও তো আমার ছিল না!’
কবির নির্মল দুঃখবিলাসে পারভীন মাঝেমাঝে খেই হারিয়েছেন। নিজের দেহ ও মানস ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে তার নারীমন। চোখের কাজল ভিজিয়ে সেই কালি দিয়েই তিনি আবার লিখেছেন, ফিরে এসেছেন মুশাহেরার জলসায়।
‘মেয়েদের দুঃখ অদ্ভুত, আর সুখ তার চেয়েও অদ্ভুত; তারা হাসছে আর তার সাথে ভিজে যাচ্ছে চোখের কাজল..’
১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে ইসলামাবাদে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান শাকির। সেদিনও ছিল বৃষ্টির দিন। মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সে পৃথিবীশূন্য করে চলে যান খুশবু বিলানো এই কবি। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত এই আয়ুষ্কালে তিনি উর্দু কবিতার ক্যানভাসে এমন কিছু রঙ ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, যা সময়ের ধুলোয় হয়তো কিছুটা ম্লান হতে পারে কিন্তু মুছে যাবে না কখনও।
/এএম