পদতলে ফুটবল–১
মহাতারকা বা দুরন্ত ফর্মই বিশ্বকাপে শেষ কথা নয়
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১১:২২ এএম
আল মাহফুজ ⚫
‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয় অলিম্পিক গেমসকে। কারণ, এটি বিশ্বজুড়ে খেলার সবচেয়ে বড় উৎসব। দুই শতাধিক দেশের দশ হাজারেরও বেশি ক্রীড়াবিদের অংশগ্রহণে হয় এই ক্রীড়া মহোৎসব। এজন্য অন্য কোনো ইভেন্টকে অলিম্পিকের সঙ্গে তুলনা করা হয় না। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ? দর্শকপ্রিয়তার বিচারে যার উন্মাদনা ক্রমশ বর্ধমান। এ কারণে ফুটবল বিশ্বকাপকেও অনেকে 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' বলে ডাকে।
এই গ্রেটেস্ট শোতে প্রথমবারের মতো এবার রেকর্ড ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে। হট ফেভারিট হিসেবে দেখা হচ্ছে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগালকে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা রয়েছে দারুণ ছন্দে। সাম্বা নৃত্যে মিশন হেক্সার স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। ফেভারিটের তালিকার বাইরে নয় ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসও।
এখন কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিক ফর্ম বা বড় বড় নাম বিবেচনা করে আপনি যদি বিশ্বকাপে দলগুলোর আগাম সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প দাঁড় করান, তাহলে অনেক সময়েই আপনার জাজমেন্ট ভুল প্রমাণিত হতে পারে। আপনি হয়তো ভাবছেন, অমুক দল এবার বুঝি শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে কিন্তু বাস্তবতার ময়দানে দেখা যাবে– তারা 'পপাত ধরণীতল!' দুয়েকটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানো যাক।

২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা খেলতে আসে ল্যাতিন আমেরিকার বাছাইপর্বের শীর্ষে থেকে। আপনি শুধু সেই দলের ফুটবলারদের নামগুলো পড়েন– আয়ালা, সরিন, ওয়াল্টার স্যামুয়েল, জেনেত্তি, ভেরন, ওর্তেগা, পাবলো আইমার, ক্রেসপো, ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই কোচ মরিসিও পচেত্তিনো ও দিয়েগো সিমিওনেও ছিল সেই দলের সদস্য। কিন্তু ফলাফল কী? সেবারের আসরে প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায় বাতিগোলের দল।
ঐ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সও রাজসিক বেশে এসেছিল। থিয়েরি অঁরি, ডেভিড ত্রেজেগেরা ছিল তুখোড় ফর্মে। আর জিনেদিন জিদান তো মহাতারকা। ইউরোপ একপ্রকার মাতোয়ারা তখন ফরাসি সৌরভে। কিন্তু তারাও শেষতক গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে পারেনি।
সুতরাং, বড় বড় নামের ভার কিংবা দুরন্ত ফর্ম আপনাকে চ্যাম্পিয়ন হবার গ্যারান্টি দেয় না। তা দিতে পারলে ১৯৫৪ ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপে শিরোপা উঁচিয়ে ধরতো হাঙ্গেরি ও নেদারল্যান্ডস। কিন্তু কখনও ভাগ্য নির্মম পরিহাস করে, কখনও প্রতিপক্ষের ঝলসানো পারফরম্যান্স আপনাকে ছিটকে দেয় অথৈ সাগরে।
আবার এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে দারুণ প্রস্তুতি নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা। লিওনেল মেসিরা তখন রীতিমতো উড়ছে। অথচ বিশ্বকাপের শুরুতে 'পুঁচকে' সৌদির কাছে হেরে চুপসে যায় আকাশি-সাদা বেলুন। এই হার সম্ভবত কোচ স্কালোনিকে 'রিয়ালিটি চেক' দেয়। ফলাফল, টুর্নামেন্টের সবগুলো ম্যাচ জিতে (টাইব্রেকারসহ) মেসির হাতে ওঠে আরাধ্য সেই ট্রফি। আনন্দের সব রঙ যেন সেদিন যোগ হয় কাতারের ফাগুন হাওয়ায়।

অর্থাৎ শুধু তারকা, মহাতারকায় ভরসা না রেখে বড় টুর্নামেন্টের জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া ভীষণ দরকার। যে কোচ বা ম্যানেজার ম্যাচ বাই ম্যাচ বিপক্ষের (কিংবা নিজের) দুর্বলতা বুঝে নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি সাজাবে, তাদের সফল হবার সম্ভাবনা প্রবল। মনে রাখবেন, বড় টুর্নামেন্ট জিততে দম লাগে। প্রেশার সিচুয়েশন বা ক্রাঞ্চ মোমেন্ট হ্যান্ডল করা জানতে হয়। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন বলেছিলেন, 'অ্যাটাক ম্যাচ জেতায় আর ডিফেন্স জেতায় ট্রফি।' এই মহাগুরুত্বপূর্ণ কথাটিও আপনার ভুলে গেলে চলবে না।
কাগজে-কলমে সেরা দল বিশ্বকাপ জিততে পারে। আবার নাও জিততে পারে। আপনার দলে একজন ভালো কোচ আর একঝাঁক কুশলী খেলোয়াড় থাকলে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। তবে আপনি কখনও ট্রফি জেতার ক্ষেত্রে হান্ড্রেড পারসেন্ট কনক্লুশনে আসতে পারবেন না।