পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন
তৃণমূল-বিজেপির নতুন বাইনারি, বাম-কংগ্রেস কি একেবারেই শেষ?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
মেহেদী হাসান রোমান⚫
দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ভোট প্রদানের হার ৯০ শতাংশের বেশি। বুথফেরত নানা সমীক্ষার জেরে শোনা যাচ্ছে, এগিয়ে রয়েছে রাজ্যের বর্তমান বিরোধী দল বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি লোকসভা ভোটের নিরিখে রাজ্যে একাধিকবার ভালো ফলাফল করলেও বঙ্গের ক্ষমতায় এখনও অভিষেক হয়নি নরেন্দ্র মোদির দলের। ফের ক্ষমতায় আসবেন, এমন আশা তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) নেত্রী মমতারও। তবে টিএমসি-বিজেপির এই যুগে যেন হারিয়ে গেছে একসময় টানা ৩৪ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা বাম (সিপিআইএম)। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধির দলেরও যেন একই দশা।
গত কয়েকবছর এই রাজ্যে বাম ও কংগ্রেসসহ বেশ কিছু দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি শব্দ ছিল, তা হলো 'বিজেমূল'। এই শব্দটি তৃণমূল ও বিজেপির সংমিশ্রণে তৈরি। যারা এটি ব্যবহার করেন, তাদের ভাষ্য— এই দুই দলের কার্যপ্রণালি দৃশ্যত আলাদা মনে হতে পারে। তবে, দুই দলের রাজনীতিই পরোক্ষভাবে একই ধরণের।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা মুসলিম ভোটারদের ভোট পেতে লোক দেখানো 'মুসলিম তোষণ' ও 'অসাম্প্রদায়িক' রাজনীতি করে। অপরদিকে, বিজেপির দিকে আঙুল, এই দলটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট ও রাজ্যের হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দ্য-মেলবন্ধন নষ্ট করছে। মূলত, 'ধর্ম' ইস্যুটাই এখানে বিবেচ্য বিষয়। দুই দলের রাজনীতিতে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেখানে অর্থনীতি, শিল্পের উন্নয়নের চেয়েও নাকি ধর্মটাই বেশি থাকে।
সবশেষ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বাম এবং কংগ্রেস উভয় দলের বিধায়কের সংখ্যা শূন্য। হ্যাঁ, একেবারে 'জিরো'। ২০১১ সালে রাজ্যের পালাবদলের সেই ভোটে যেবার মমতা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, সেবার বামেদের আসন সংখ্যা ছিল ৬২টি। পরের ধাপে তারা পিছিয়ে যায় কংগ্রেসের চেয়েও। ২০১৬ নির্বাচনে কংগ্রেসের ৪৪টির বিপরীতে বাম পায় ২৬টি। এর আগের দফায় কংগ্রেসের সিট ছিল ৪৬টি।
তবে, এই রাজ্যের দৃশ্যপট ঘুরে যাওয়ার সূত্রপাত মূলত ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের পর। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পর স্বভাবতই বিজেপির নজর ছিল সব রাজ্য বিধানসভায় ভালো করা। গত তিন দফায় কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি। ১৫টির বেশি রাজ্যেও তারা ক্ষমতায়। তবে বেশিরভাগই উত্তর ও মধ্য ভারতে।
২০১৫ সালের পর রাজ্য বিজেপির যে কয়জন সভাপতি ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম— রাহুল সিনহা, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমজার ও শমীক ভট্টাচার্য। দলকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা তারা করেছেন। অপরদিকে, তৃণমূল সভানেত্রী মমতা যেন বিজেপির বিপরীতে সমান্তরালের একক মুখ। বিতর্ক কিংবা টক-শো'তে বাম-কংগ্রেসের মুখপাত্র অনেক দেখা যায়, কিন্তু পোস্টারে ভোটারদের মনে 'ক্লাইম্যাক্স' নিয়ে আসতে পারে এমন জনপ্রিয় মুখ নেই।
ক্ষমতাসীন টিএমসি ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিজেপির এই দশকব্যাপী চলা লড়াইয়ে স্বভাবতই আস্তে আস্তে আলোচনার বাইরে চলে গেছে বাম ও কংগ্রেস। এর মাঝে, তৃণমূলের বেশ কয়েকজন হাইপ্রোফাইল নেতাকে দলে ভিড়িয়েছে বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারী তেমনই একজন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বাম-কংগ্রেসের একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার প্রধান কারণগুলো কী? এর উত্তর সহজভাবে বললে, ২০১১ সালে 'পরিবর্তন' হাওয়া তো আছেই। পাশাপাশি 'গেরুয়া শিবিরের' উত্থান।
গত এক দশকে টিএমসির মমতা ব্র্যান্ডিংয়ে 'বাংলার মেয়ে' এই রাজ্যে বাঙালি জাতিগত মেলবন্ধনের নিয়ামক হিসেবে জ্বালানি জুগিয়েছে। অপরদিকে, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদে বিজেপির জুড়ি মেলা ভার। এর বিপরীতে, বাম-কংগ্রেসের রাজনীতিতে এমন কোনো উপাদান নেই, যা টিএমসি-বিজেপির 'জাতি' ও 'ধর্মের' বিপরীতে বড় বয়ান তৈরি করে।
জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অপরদিকে, কংগ্রেসের হয়ে এই পদে ছিলেন বিধানচন্দ্র রায় কিংবা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মতো রাজনীতিকরা। বর্তমানে রাজ্যের বাম-কংগ্রেসের প্রধান মুখ যারা, তারা মোদি-মমতার সমান্তরালে যেমন নেই, তেমনি সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীদের রাজনৈতিক 'পোর্টফোলিও'র নিরিখে যেন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে।
তবে বাম শাসনের যে পতন তার নেপথ্যে ছিল— শিল্পায়নের ধীরগতি ও কর্মসংস্থানের অভাব। তেমনি সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক ও সহিংসতাও। গত দেড় দশকে মমতার সরকারও এক্ষেত্রে প্রায় একই বলা যায়। এই রাজ্যের শিক্ষিত যুবকদের এখনও চাকরির জন্য যেতে হয় চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বাইতে।
শিল্পায়নে পশ্চিমবঙ্গ বামেদের রেখে যাওয়া গল্পের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন চেহারা খুব একটা দিতে পারেনি। বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায় এটি বেশ লক্ষ্য করা গেছে। বিজেপি সমর্থকদের একটা অংশ মনে করে এমনটাই। ধর্মের রাজনীতির পাশাপাশি বিজেপি নাকি শিল্পে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে রাজ্য, যদি তারা সুযোগ পায়।
তাই, ২০১১ সালের পরিবর্তনের পরিবর্তনও হতে পারে এবার। আবার হয়ত টিএমসিকে ফের সুযোগ দিতে পারে রাজ্যবাসী। এর উত্তর পাওয়া যাবে ৪ মে। আপাতত টিএমসি-বিজেপির এই বাইনারিতে পশ্চিমবঙ্গে যে একেবারেই আলোচনার বাইরে বাম-কংগ্রেস, এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।
/এমএইচআর