×
Logo

বিনোদন

লাকী আখান্দ: বাংলা গানের নীল মণিহার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

লাকী আখান্দ: বাংলা গানের নীল মণিহার

আল মাহফুজ ⚫

১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাস। দাবদাহে যখন নগরবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন ঢাকায় প্রথমবারের মতো আগমন শিল্পী অঞ্জন দত্তের। জাতীয় জাদুঘরে চলছে জলসা। জলসা তো নয় যেন ঝরছে গানের তুষারপাত! অঞ্জন দত্তকে হঠাৎ জানানো হয়, অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশের এক গুণী শিল্পী। 'রঞ্জনা'র স্রষ্টা নিছক আসর জমানোর উদ্দেশ্যে তাকে মঞ্চে আসার আহ্বান জানান। তিনিও আহ্বানে সাড়া দেন। মজার ব্যাপার হলো, দুজনের কেউই তখন অব্দি পরস্পরের গান শোনেননি অথচ তাদের গানে আসর জমে গেল। বহুদিন পর সেই শিল্পীকে সংগীতের সুধায় উন্মত্ত হতে দেখা গেলো। অঞ্জন দত্ত মঞ্চে তার সঙ্গ পেয়ে এতোই মুগ্ধ হলেন যে, পরবর্তীতে তাকে নিয়ে আস্তো একটা গান বেঁধে ফেললেন। গানের নাম 'একজন লাকি আখান্দ'।

'দুজনে হয়তোবা ভাবে, আবার কোনো জলসায়
গান হবে কাছে আসার জন্য, পয়সার জন্য নয়
একজন চায় বড় বেশি চায়, একজন হয়তো কম
একজন যদি হয় অঞ্জন আর একজন লাকী আখান্দ'

পুরান ঢাকায় জন্ম লাকী আখান্দের। সংগীতের প্রতি তার অনুরাগ তৈরি হয় মূলত পরিবার থেকে। পাঁচ বছর বয়সে বাবা আবদুল আলী আখান্দের হাত ধরে সংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি লাকীর। তার সহোদর বাংলা গানের আরেক প্রতিভা হ্যাপি আখান্দ। লাকী ও হ্যাপি ছিল হরিহর আত্মা। ১৯৮৭ সালে হ্যাপির মৃত্যুতে লাকীর সংগীতজীবন প্রায় থমকে যায়। শামুকের মতো গুটিয়ে রাখেন নিজেকে। গান থেকে দূরে থাকেন অনেক দিন। 

লাকী আখান্দের অ্যালবাম সাকুল্যে সাতটি কিন্তু গান নিয়ে যা করেছেন, সেটাই তাকে স্থান দিয়েছে ইতিহাসের চূড়ায়। তার অসংখ্য গানে এখনও শ্রোতার মন আন্দোলিত হয়। এখনও অনেকেই আনমনে গুনগুন করেন তার সুরধ্বনি। ভালোবাসার আখরে লিপিবদ্ধ একটি নাম। আটপৌরে আড্ডার সাথে, জীবনের ছন্দের সাথে হাতেগোনা যেকটা নাম জড়িয়ে থাকে, তার একটি আলবত লাকী।

লাকী আখান্দ বেঁচে আছেন গানের মাধ্যমেইগিটার হাতে লাকী আখান্দ

১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হলেও লাকীর গানের সাবালক সফর আরও আগে। এই সুরসম্রাটের সিগনিফিকেন্ট সৃষ্টি ছিল পপ, ফোক ফিউশনের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের মেলবন্ধন। তিনি মেলোডি নিয়ে খেলতেন। হামিং-শেকারের মাধ্যমে বিচিত্রতার পাখা মেলে ধরতেন। স্প্যানিশ সুরের সাথে সম্মিলন ঘটাতেন দেশীয় ধ্রুপদীর। ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে গান তৈরি করে শ্রোতাদের স্বাদ দিতেন নতুনত্বের। লাকী সুর বা বাদ্য নিয়ে এমন সব সৃষ্টি করতেন, যা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতো। মিউজিশিয়ানরা বলাবলি করতো, তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে!

লাকীর কোন সৃষ্টি শ্রোতারা মনে রাখেনি? যেটিই হাত দিয়ে ছুঁয়েছেন, স্বর্ণ হয়ে ফলেছে। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না’, 'আবার এল যে সন্ধ্যা', ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’, 'আগে যদি জানিতাম', ‘মামুনিয়া’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, ‘তুমি কি দেখেছ পাহাড়ি ঝর্ণা’, ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’, ‘কী করে বললে তুমি’, ‘লিখতে পারি না কোনো গান’, ‘ভালোবেসে চলে যেয়ো না’, ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান লিখেছি’ প্রভৃতি। বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে লাকীর নাম জড়িয়ে আছে ভিন্ন এক মাইলফলক হয়ে।

দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে ভুগে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। এখনও লাকী কতটা প্রাসঙ্গিক, তার সবশেষ উদাহরণ ‘যার কাছে মন রেখে’। ৩৪ বছর আগে গানটিতে (গীতিকার গোলাম মোর্শেদ) সুর বসিয়েছিলেন ছন্দ-লয়ের কারিগর। এরপর নানা কারণে থেমে গিয়েছিল কাজ। অবশেষে তিন দশক পর গানটি যেন পূর্ণতা পেল সংগীতশিল্পী তরুণ মুন্সীর কণ্ঠে। এভাবে তরুণ ধমনীতে সুরের জাদুকর জড়িয়ে থাকছেন আঙ্গুরলতার মতো।

লাকী আখান্দ যে কত বড় মাপের সংগীতস্রষ্টা, তার ভার মহাকালের কাছে তোলা থাক। লাকীর গানে জলসার মখমল আছে, সুরদরিয়ার উথালপাথাল ব্যঞ্জনা আছে। লাকীর গানে দ্বীপজ্বালা রাত আছে, বিমূর্ততায় পুরাকীর্তির আকাঙ্ক্ষা আছে। ‘নীল মনিহার’ গানে শিল্পী গেয়েছিলেন–

'এই নীল মনিহার
এই স্বর্ণালি দিনে
তোমায় দিয়ে গেলাম
শুধু মনে রেখো'

গানের মধ্য দিয়ে 'ফেরারি পাখি' ভক্তদের যেন তার সুগভীর বার্তাটি দিয়ে গেলেন। বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি তাকে। আরেকবার শীত গড়িয়ে যাবে। লাকী আখান্দকে মনে রাখা হবে। জলসায় হবে উপচে পড়া ভিড়। লাকী বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ।

Logo