×
Logo

মতামত

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার নামে মরীচিকার ফাঁদ

জাহিদ হোসাইন খান

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার নামে মরীচিকার ফাঁদ

বাংলাদেশের জ্বালানি মানচিত্র গত এক দশকে আমূল বদলে গেছে। একসময় দেশীয় গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ খাত এখন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর। ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার এই মহাআয়োজনের আড়ালে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিপর্যয় ও পরিবেশগত অবিচার লুকিয়ে আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফেয়ার ফাইন্যান্স বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের গবেষকদের উদ্বেগ এখন সেই দিকেই।

এলএনজি নির্ভরতা বাড়ছে

জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এলএনজিকে বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে এটি এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। গত আট বছরে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩৭ শতাংশ। দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমতে থাকায় আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে আর্থিক ন্যায্যতার।

এলএনজি আমদানির জন্য যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে, তা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য কতটা টেকসই? বিশেষ করে যখন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম অস্থিতিশীল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে বাংলাদেশের রিজার্ভের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানিতে ঝুঁকে পড়া কতটা প্রয়োজন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মেগা প্রজেক্ট ও ঋণের বোঝা

২০১৯ সালে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩৬শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগ ও জার্মান সংস্থা সিমেন্স কোম্পানির মধ্যে একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানা যায়, দেশে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন আরো একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জোর প্রস্তুতি নিয়েছে পেট্রোবাংলা। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার টার্মিনালটি নির্মাণ করা হবে। দেশে বাস্তবায়নাধীন এলএনজি-ভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর স্বপ্ন দেখালেও এর ফাইন্যান্সিং মডেল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এই প্রকল্পগুলোর বড় অংশ আসে বিদেশি ঋণ থেকে। যখন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে, তখন এই বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফেয়ার ফাইন্যান্স বা ন্যায়সংগত অর্থায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই বিশাল বিনিয়োগের অপরচুনিটি কস্ট অনেক বেশি। যদি এই অর্থের একটি অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা দেশীয় গ্যাস কূপ খননে ব্যয় হতো, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক কম হতো। এলএনজি নির্ভর মেগা প্রজেক্ট আদতে একটি ঋণের ফাঁদে ফেলছে কি না, তার কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করা এখন সময়ের দাবি।

মিথেন লিকেজের সম্ভাবনা

এলএনজিকে প্রায়ই কয়লা বা তেলের চেয়ে পরিষ্কার জ্বালানি হিসেবে বিপণন করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। এলএনজি মূলত মিথেন গ্যাস, যা নিষ্কাশন ও পরিবহনের সময় বায়ুমণ্ডলে চুইয়ে পড়ে। মিথেন গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে অন্তত ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস। দেশের বিভিন্ন নদী সংলগ্ন এলএনজি অবকাঠামোর কারণে স্থানীয় বায়ু ও পানি দূষণ বাড়ছে। এলএনজি টার্মিনালের কুলিং সিস্টেমের কারণে সংলগ্ন জলাধারের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ। অথচ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষায় অনেক সময়ই এই সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক প্রভাবগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এটি সরাসরি পরিবেশগত অবিচার বা এনভায়রনমেন্টাল ইনজাস্টিস।

প্রান্তিক মানুষের ওপর প্রভাব

জ্বালানি মেগা প্রজেক্টের নামে যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যজীবী সমাজ। মেঘনা পাড়ের জেলেরা এখন আর আগের মতো মাছ পায় না; কারণ বিশাল বিশাল জাহাজের আনাগোনা আর তেলের নিঃসরণ নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করেছে। অন্যদিকে, এলএনজি আমদানির খরচ সামলাতে সরকার যখন গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়ায়, তখন তার সবচেয়ে বড় আঘাত আসে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর। শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও আকাশচুম্বী হয়। 

সমাধানের পথ

বর্তমানের জ্বালানি সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হলো টেকসই জ্বালানি রূপান্তর। এলএনজি আমদানির পেছনে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি অংশ দিয়ে দেশীয় স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা প্রয়োজন। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়াতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিটি মেগা প্রজেক্টের চুক্তি ও ঋণের শর্তাবলি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা। প্রকল্প এলাকায় কমিউনিটির মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে নিয়মিত সোশ্যাল ও এনভায়রনমেন্টাল অডিট করা।

জ্বালানি নিরাপত্তা মানে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং সাশ্রয়ী ও টেকসই উপায়ে মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো। এলএনজি নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে যে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হতে হবে। অগ্রগতির উজ্জ্বল আলো যেন দামি গ্যাসের ধোঁয়ায় মলিন না হয়, সেদিকেই এখন নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া জরুরি। জ্বালানি খাতের মেগা প্রজেক্ট সমাজ ও প্রকৃতিবান্ধব হয় সেই বিষয়টি বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।

/এএন

Logo