জমজম: হাজার বছর ধরে হাজিদের সেবা দেওয়া এক ঐতিহাসিক ফোয়ারা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
‘জমজম কূপ’ যেটি মুসলিম উম্মাহর কাছে পরিচিত পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এবং বরকতময় পানির উৎস হিসেবে। এই কূপটির অবস্থান সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদ-উল-হারামের ভেতরে, পবিত্র কাবা শরিফ থেকে মাত্র ২১ মিটার পূর্ব দিকে। প্রায় ৪ হাজার বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক কূপটির সূচনা কোনো মানুষের খনন কার্যের মাধ্যমে হয়নি, বরং এটি মহান আল্লাহর এক মহান অলৌকিক নিদর্শন।
জমজম কূপের ইতিহাস সরাসরি জড়িয়ে আছে আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা এবং শিশু পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সাথে। আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাইলকে মক্কার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে এক জনমানবহীন, শুষ্ক ও উত্তপ্ত মরুভূমিতে রেখে আসেন। তাঁদের কাছে খাবার বলতে ছিল কেবল কিছু খেজুর এবং অল্প জল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই পানি ও খাবার শেষ হয়ে গেলে মা হাজেরা তাঁর তৃষ্ণার্ত সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। পানির খোঁজে তিনি তীব্র রোদের মধ্যে পার্শ্ববর্তী ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড়ের চূড়ায় দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন। এভাবে তিনি দুই পাহাড়ের মাঝে মোট ৭ বার চক্কর দেন। যেটিকে স্মরণে রাখতে হজের অন্যতম রোকন ‘সাঈ’ হিসেবে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ওয়াজিব করা হয়।
যখন ক্লান্ত মা হাজেরা শিশু ইসমাইলের কাছে ফিরে আসেন, তখন দেখতে পান তৃষ্ণার্ত শিশুটি মরুভূমির বুকে পা ছুড়ে কান্নাকাটি করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.) সেখানে আবির্ভূত হন এবং তাঁর ডানা দিয়ে মাটিতে আঘাত করেন (যেখানে ইসমাইল (আ.) পা ছুড়ছিলেন)। সাথে সাথেই শুষ্ক বালু ফেটে পানির এক তীব্র ফোয়ারা বের হতে থাকে।
জমজম কূপকে কেন্দ্র করেই মূলত মক্কা নগরীতে মানুষের জনবসতি শুরু হয়। প্রথমে ‘জোরহুম’ গোত্র এই পানির কারণে মক্কায় এসে বসবাস শুরু করে। বিভিন্ন কিতাব থেকে পাওয়া তথ্য, কিন্তু কয়েক শতাব্দী পর মক্কার রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং জোরহুম গোত্রের অন্যায়ের কারণে আল্লাহর গজবে কূপটি শুকিয়ে যায় এবং একপর্যায়ে তারা বিদায় নেওয়ার সময় কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়ে যায়। ফলে দীর্ঘকাল এটি মক্কার বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।
এরপর, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের কিছুদিন আগে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমকে স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহ এই পবিত্র কূপের সঠিক অবস্থান ও নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি স্বপ্নলব্ধ নির্দেশনা অনুযায়ী মক্কার কুরাইশদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মাটি খুঁড়ে পুনরায় জমজম কূপের সন্ধান পান। এরপর থেকে এই কূপের পানি হাজীদের পান করানোর দায়িত্ব (সিকায়া) আব্দুল মুত্তালিবের পরিবারের ওপর ন্যস্ত হয়। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হজ ও ওমরাহর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
আবার এই কূপের পানির রয়েছে কিছু অলৌকিক বৈশিষ্ট্য। যা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই পানি পান করছে, বিশেষ করে হজের মৌসুমে প্রতিদিন লাখ লাখ গ্যালন পানি তোলা হয়, কিন্তু কখনোই এই কূপের পানি শুকায়নি বা এর স্তর কমেনি। এর পানির রয়েছে প্রাকৃতিক পরিশোধন ক্ষমতা। এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার না করা সত্ত্বেও এতে কোনো শ্যাওলা, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক জন্মায় না। এটি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত।
এছাড়া এই পানিতে রয়েছে খনিজের প্রাচুর্য। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফ্লোরাইড রয়েছে, যা মানবদেহের ক্লান্তি দূর করে এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে, তা সফল হবে।’
সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্যমতে, অতীতে নির্দিষ্ট পানি বাহকরা মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ এবং মদিনার মসজিদে নববীজুড়ে জমজমের পানি বিতরণ করতেন। পানি সংরক্ষণ করা হতো বড় বড় মাটির পাত্রে, যাতে সতেজতা ও সুগন্ধ বজায় রাখতে মেশানো হতো মাস্তিক ও তায়েফের গোলাপজল। এরপর বহনযোগ্য পাত্রে করে মুসল্লিদের হাতে হাতে পানি পৌঁছে দেয়া হতো এবং পবিত্র নগরীগুলোতে হাজিদের আবাসনেও সরবরাহ করা হতো।
সময়ের সঙ্গে হাজিদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই ব্যবস্থা আরও সংগঠিত রূপ নেয়। কিং আবদুল আজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভস এর তথ্যমতে, ১৯২৬ সালে বাদশাহ আবদুল আজিজের শাসনামলে হজ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে জমজম পানি বিতরণ নিয়ন্ত্রণে আনে সৌদি সরকার। সেই সময় মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ ঘিরে হাজিদের সুবিধার্থে একাধিক ‘সাবিল’ বা পাবলিক জমজম ফোয়ারা নির্মাণের নির্দেশও দেন বাদশাহ আবদুল আজিজ।
পরবর্তীতে সৌদি আরবের বিভিন্ন শাসক এই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করেন। বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলে চালু হয় ‘কিং আবদুল্লাহ জমজম ওয়াটার প্রজেক্ট’। এর মাধ্যমে আধুনিক বিশুদ্ধকরণ, বোতলজাতকরণ ও পরিবহন প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। প্রকল্পটিতে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং ব্যবস্থা, জীবাণুমুক্তকরণ সুবিধা এবং প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টেইনলেস স্টিল পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সমন্বয়ে জমজমের পানি বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় বোতলজাত কারখানাগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি বোতল উৎপাদন করছে। একইসঙ্গে ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে পানির গুণগত মান, নিরাপত্তা ও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে মক্কা ও মদিনাজুড়ে। তবে প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের পরও জমজম সেবার মূল লক্ষ্য, পবিত্র সফরে আসা হাজিদের জন্য সহজে জমজমের পানি নিশ্চিত করা অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে সৌদি ওয়াটার অথরিটির তথ্যমতে, হজ মৌসুম উপলক্ষে জিলহজের ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত (১৮ মে থেকে ২৫ মে) মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলোতে ৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি পানি বিতরণ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, শুধু ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বা ৮ জিলহজেই ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ ঘনমিটারের বেশি পানি সরবরাহ করা হয়। ওইদিন হাজিদের মিনাসহ পবিত্র স্থানগুলোতে যাত্রার কারণে পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এছাড়া পানির গুণগত মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে একই দিনে বিভিন্ন স্থানে ৪ হাজার ৬২৫টি পরীক্ষাও পরিচালনা করেছে কারিগরি ও পরীক্ষাগার টিম।
সৌদি ওয়াটার অথরিটির তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে হজ মৌসুমজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে হাজিরা নির্বিঘ্নে ও স্বস্তির সঙ্গে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারেন।
(তথ্যসূত্র: আরব নিউজ)
/এনএ