বিবিসি'র প্রতিবেদন
সিঙ্গাপুরে দত্তক দেওয়ার নামে শিশু বিক্রির অভিযোগ: ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ জনের মামলার রায় আজ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
সিঙ্গাপুরে দত্তক দেওয়ার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে শিশু কেনাবেচার অভিযোগে অভিযুক্ত একটি চক্রের বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একটি আদালত। আলোচিত এই মামলাটি গত বছর সামনে আসার পর ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। একই সঙ্গে দত্তক নেওয়া অনেক অভিভাবকও উদ্বেগে পড়েন।
পশ্চিম জাভার একটি আদালতে এ মামলায় ১৯ জনের বিচার চলছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন নারী ও একজন পুরুষ। অভিযোগ, তারা শিশু পাচার করে এবং অবৈধভাবে দত্তকের প্রক্রিয়াকে বৈধ দেখাতে জাল নথি তৈরি করেছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের মাধ্যমে মোট ৩৪টি শিশুকে পাচার করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ২০ শিশুকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। চলতি বছরের শুরুতে বিচার চলাকালে জানা যায়, এরই মধ্যে অন্তত ১২টি শিশু সিঙ্গাপুরে পৌঁছে গেছে।
অভিযুক্তরা আদালতে দাবি করেছেন, তারা জানতেন না যে তাদের কর্মকাণ্ড বেআইনি। তাদের ভাষ্য, তারা শুধু 'পরিবারগুলোকে সহায়তা' করার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অভিযুক্তদের পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের দাবি করেছেন।
চক্রের মূলহোতা হিসেবে ইন্দোনেশীয় নারীকে অভিযুক্ত
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, মামলার অন্যতম আসামি ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক লি সিউ লুয়ান এই চক্রের মূলহোতা। ৭০ বছর বয়সী লি'র বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ, শিশু সংগ্রহ, তাদের দেখভাল এবং জাল নথি তৈরির কাজ পরিচালনা করতেন।
এছাড়া জন্মসনদ ও দত্তক সংক্রান্ত নথি জাল করার জন্য আলাদা একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
লি স্বীকার করেছেন, তিনি অন্তত চারজন সিঙ্গাপুরীয় ব্যক্তির কাছে দত্তকের জন্য শিশু সরবরাহ করেছিলেন। এসব শিশুর প্রতিটির জন্য ১৮ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
আদালতে লি বলেন, বিদেশে দত্তকের জন্য শিশু পাঠানো যে বেআইনি, তা তিনি জানতেন না। তার দাবি, সিঙ্গাপুরের সহযোগী তাকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে পুরো প্রক্রিয়াটি বৈধ। তার বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ
২০২২ সালের শেষ দিকে: অভিযোগ অনুযায়ী, দত্তকের জন্য শিশু সংগ্রহ করতে সিঙ্গাপুরের কয়েকজন ব্যক্তি লি সিউ লুয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
২০২৩-২০২৫ সাল: চক্রের সদস্যরা ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরে দত্তকের নামে অবৈধভাবে শিশু কেনাবেচা করে বলে অভিযোগ ওঠে।
এপ্রিল ২০২৫: এক ব্যক্তি পশ্চিম জাভা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, দত্তকের জন্য দেওয়া তার নবজাতক সন্তানকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর তদন্ত শুরু হয়।
জুলাই ২০২৫: ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ চক্রটি ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে।
জানুয়ারি ২০২৬: তদন্তের কারণে ইন্দোনেশিয়া থেকে দত্তক নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত করে সিঙ্গাপুর।
এপ্রিল ২০২৬: ১৯ অভিযুক্তের বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে অন্তত ১২টি শিশু সিঙ্গাপুরে পাঠানোর তথ্য সামনে আসে।
আদালতে হাজির অভিযুক্তরা
রায় ঘোষণার আগে আদালতে নেওয়ার সময় অভিযুক্তদের লাল রঙের পোশাক পরা অবস্থায় দেখা যায়। পোশাকের পেছনে লেখা ছিল 'ক্রিমিনাল ডিটেইনি'।
আদালতে প্রবেশের সময় তারা মাথা নিচু করে ছিলেন এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরা এড়াতে মুখ ঢেকে রাখেন। অভিযুক্তদের একজন অ্যাস্ট্রি ফিত্রিনিকা আদালতে দৃশ্যত ভেঙে পড়েন এবং শ্বাস নিতে সমস্যায় পড়ছিলেন বলে জানা গেছে। আদালতের কর্মকর্তারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এই কথিত শিশু পাচার চক্রের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন।
ইন্দোনেশিয়ায় শিশু পাচারের আরও কয়েকটি ঘটনা
ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু পাচারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এর বেশির ভাগ ঘটনায় দেশের অভ্যন্তরেই শিশু স্থানান্তরের অভিযোগ ছিল।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দেশব্যাপী একটি শিশু পাচার নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জানুয়ারি ২০২৬: মেডানে আরেকটি চক্রের নয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তারা গর্ভবতী নারীদের ভাড়া বাসায় রেখে পরে অবৈধভাবে শিশু দত্তকের ব্যবস্থা করত।
২০২৫ সালে: পেকানবারু ও এনগাওয়িতে দুটি কথিত শিশু পাচার চক্র শনাক্ত করে পুলিশ।
জুলাই ২০২৪: বালিতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে শিশু পাচারের অভিযোগে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়।
ডিসেম্বর ২০২৪: ইয়োগাকার্তা পুলিশ দুই ধাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। অভিযোগ ছিল, ২০১০ সাল থেকে তারা অবৈধ দত্তক কার্যক্রম চালিয়ে অন্তত ৬৬টি শিশু বিক্রি করেছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শিশু পাচার-সম্পর্কিত অপহরণের ৯১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৮০ শিশু জড়িত ছিল।
/এআই