সিএনএনের বিশ্লেষণ
পুনরায় সচল ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, প্রকাশ্যে মার্কিন বোমাবর্ষণ কৌশলের সীমাবদ্ধতা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
দ্রুতগতিতে চাপা পড়ে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার করায় আবারও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের দিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে ইরান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা মার্কিন বোমা হামলা কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা কয়েক সপ্তাহের হামলায় ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ এবং সংযোগ সড়ক ধ্বংস করা হয়েছিল। ফলে এসব ঘাঁটিতে প্রবেশ ও অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে দাবি করেছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
তবে সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত টানেল ও প্রবেশপথ পুনরুদ্ধার করছে ইরান। এতে ধারণা করা হচ্ছে, কেবল টানেলের মুখ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধ চলাকালে প্রবল ঝুঁকি নিয়েও টানেলের প্রবেশপথ খনন ও পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যায় ইরান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায়ই এসব কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, তবুও ইরান সীমিত পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। সাত সপ্তাহ আগে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের কাজ আরও জোরদার করা হয়েছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ৬৯টি টানেল প্রবেশপথের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫০টিই পুনরায় চালু করেছে ইরান।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র মজুত থাকায় লঞ্চার ও অপারেটর থাকলে ইরান হামলা চালিয়ে যেতে পারবে। তার ভাষ্য, 'ইরানের হাতে এখনো বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার ঠেকানোর মতো কোনো বাধা নেই।'
স্যাটেলাইট ছবিতে আরও দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কও মেরামত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও নতুন করে পিচ ঢালাইও করা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনের অনুসন্ধান নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় ও স্থানে অভিযান পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে।'
যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। গত মার্চে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, লঞ্চার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পূর্ণ অকার্যকর করাকে যুদ্ধের পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো শত শত মিটার পাথরের নিচে অবস্থিত হওয়ায় সেগুলোতে সরাসরি হামলা চালানো অত্যন্ত কঠিন। ফলে যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মূলত প্রবেশপথ ও লঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যা সাময়িকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব ঘাঁটির গভীরে এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে এবং ভূপৃষ্ঠে পরিচালিত হামলায় সেগুলোর খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।
জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির গবেষক তৈমুর কাদিশেভ বলেন, 'এ ধরনের যুদ্ধের জন্য ইরান ২০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আগের তুলনায় আরও বেশি প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।'
দ্রুত পুনর্গঠনে উদ্বেগ
ইস্পাহানের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, যুদ্ধের সময় চারটি টানেল প্রবেশপথ বন্ধ করতে বহুবার হামলা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি প্রবেশপথ ইতোমধ্যে পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং ধ্বংস হওয়া সড়কও সংস্কার করা হয়েছে।
খোমেইনের বাইরে আরেকটি ঘাঁটিতে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত ১০টি নির্মাণযান প্রবেশপথ পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত ছিল বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো পুনরায় সচল হওয়ায় ইরানের সামরিক হুমকি নতুন করে জোরালো হতে পারে, বিশেষকরে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রের মজুতও ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলোতে হামলা চালানো হলেও ইরান দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তেহরান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও উৎপাদন অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নির্ধারিত সব সময়সীমাকেই ছাড়িয়ে গেছে ইরান।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্র দিয়ে যে ক্ষতি করা হয়, সাধারণ বুলডোজার ও নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করেই তার বড় অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারা ইরানের অন্যতম কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠেছে।
/এআই