আমানুল হক: এক কিংবদন্তি আলোকচিত্রী
সাইফুল আমিন কাজল
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
অনাথ মাঝির বজরা নৌকা আর চিরকুমার আমানুল হক; রান্না হতো চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি আর ভর্তা ভাত। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দেশব্যাপী ঘুরে বেড়িয়েছেন ছবির খোঁজে। একেকবার সাথে থাকতো কমপক্ষে ৬ থেকে ৭টি ক্যামেরা আর লেন্স ৭ থেকে ৮টি। ঝোলা ভরা থাকতো নানারকম প্রপস। কী থাকতো না সেই ঝোলায়– শাড়ি, চুড়ি, টিপ, কত কিছু!
আমানুল হকের অপুষ্টিজনিত সমস্যা ছিল। 'ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ' বইতে তিনি লিখেছেন— পুষ্টি সমস্যা সমাধানে অনাথ মাঝি মাঝেমধ্যেই সুস্বাদু ডাল রান্না করতেন। আলুভর্তার সাথে গরম ডাল, নৌকায় বসে খাওয়ার কি যে আনন্দ! একদিন রাতে সেই রান্না খেয়ে তৃপ্তি প্রকাশে খুশিতে আত্মহারা হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। আশপাশের নৌকার মানুষেরা ভেবেছে, এরা নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছে।
বড়ভাই আজমল হকের কাছে থেকেছেন অনেক সময়। একদিন তিনি অনাথ মাঝি আর আমানুল হককে পাশাপাশি দেখে বললেন, 'তোমার চাইতে অনাথ মাঝিকেই তো সুন্দর দেখাচ্ছে।' নৌকা ভাড়া দিতে গিয়ে অনেক সময় যন্ত্রপাতিও বিক্রি করেছেন। এই হলো এক ও অদ্বিতীয় আমানুল হক, যিনি মনপ্রাণ উজাড় করে ছবি তুলতেন, দেশ ও মানুষ ভালোবাসতেন। দেশকে প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসতেন তিনি।
বাংলাদেশের গ্রামের পর গ্রাম নৌকায় ঘুরে অগণিত ছবি তুলেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শহীদ মিনার নিয়েও কাজ করেছেন। ভাবা যায়, কতটা দেশপ্রেম আর ছবিপ্রেম থাকলে একজন মানুষ এইভাবে ছবির খোঁজে ৫ যুগ পার করে দিলেন! ছবির প্রতি এমন প্যাশন ও ভালবাসা খুব বিরল।
ক্লাস এইটে থাকতে (আনুমানিক ১৯৪০ সাল) ছবি তোলা শুরু করেন আমানুল হক। তার অগ্রজ আজমল হক ছিলেন স্বনামধন্য আলোকচিত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আলোকচিত্রী ছিলেন তিনি। এছাড়া, তার ছোটবোন আয়েশা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও গবেষক। আমানুল হক নিজেও ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্বল্প সময় (১৯৫২) শিল্পী হিসেবে চাকরি করেছেন।
রাজধানীর শাহবাগে আজিজ মার্কেটে থাকার সময়ের কথা লিখতে গিয়ে গবেষক মফিদুল হক লেখেন— '... সাক্ষাৎকার প্রদানে অনীহা ছিল প্রবল। একবার এক তরুণীকে অনুমতি দিয়েছিলেন তার ওপর ফটো ডকুমেন্টারি করার জন্য কিন্তু তরুণী বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে শয্যাগত আমানুলের ছবি তুলতে শুরু করল। মহাবিরক্ত হয়ে তাকে তাৎক্ষণিক বিদেয় জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। হাঁপানির কারণে কাবু হলেও নিজের শয্যাগত অবস্থান কাউকে দেখাতে রাজি হতেন না।' আজিজ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্ল্যাটে আমানুল হক একাকি থাকতেন শেষ বছরগুলোতে। নিজের একাকী জীবন গড়ে তোলেন সময়ের সাথে, সেই রাজ্যে তিনি ছিলেন একক রাজা।
ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক পান কিংবদন্তি এই ফটোগ্রাফার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ছবি ছাড়াও বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের অনেক চলচ্চিত্রের আনঅফিসিয়াল আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।

বাংলাদেশের ২ জন ফটোগ্রাফার সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলেছেন কাছের মানুষ হিসেবে। এক আমানুল হক, অন্যজন সাইদা খানম। দুজনেরই প্রকাশনা রয়েছে সত্যজিৎকে নিয়ে। সত্যজিতের ঘরের মানুষ হয়ে গেছিলেন তিনি। তাদের মধ্যকার চিঠি চালাচালি দেখলেই তার ধারণা পাওয়া যায়। ক্যামেরায় চোখ রাখা সত্যজিত– আমানুল হকের তোলা ছবিকে 'পথের পাঁচালী' নির্মাতা বলেছিলেন, তার দ্বিতীয় সেরা পোর্ট্রেট। প্রথমটি ছিল ম্যাগনাম আলোকচিত্রী মার্ক রিবুর তোলা।
ষাটের দশকে কলকাতার বৌবাজার থেকে পুরোনো জিনিস বিক্রি করা এক ভাঙ্গারি দোকান থেকে কম দামে একটি ভাঙাচোরা ক্যামেরা কিনেছিলেন আমানুল হক, যা দিয়েই সত্যজিতের সব ছবি তুলেছেন। সত্যজিৎ তাকে প্রায়ই বলতেন, 'এই ক্যামেরা দিয়ে আপনি কেমন করে ছবি তোলেন!' মজার বা অবাক করা ব্যাপার এই যে, আমানুল কখনোই কোনো দামী ক্যামেরা বা লেন্স ব্যবহার করেননি।
ভাষা আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ শহীদ রফিকের সেই বিখ্যাত ছবি তুলে পুলিশের রোষানলে পড়েছিলেন আমানুল হক। এই ছবি ছাত্রদের লিফলেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সারা শহর। ফটোগ্রাফারকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। পালিয়ে বেড়াতে থাকেন আমানুল, তার চাকরিটা চলে যায়। এভাবেই কেটে যায় প্রায় দুই বছর।
১৯৫৯ সালে কলকাতা চলে যান আমানুল। প্রায় এক দশক সেখানে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছবি তুলেছেন দেশে ফিরে। কলকাতায় ভালো কাজের অফার পেয়েও দেশের টানে ফিরে আসেন এই শিল্পী।

২০২৬ এর জানুয়ারিতে 'ছবিমেলা ১১'তে আমরা দেখতে পাই স্বাধীন বাংলাদেশে আমানুল হকের প্রথম একক প্রদর্শনী। শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তার পুরো জীবনের কাজ প্রদর্শিত হয়। জন্মের শত বছর পর এই সম্মান অর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফটোগ্রাফারদের মধ্যে তিনি একজন এবং আগামী শতবর্ষে তাকে নিয়ে নতুন প্রজন্ম গবেষণা করবে।
২০১১ সালে পাওয়া একুশে পদক ও সনদ আমানুল হক দান করে যান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। একটি বাড়িও দেয়া হয়েছিল তাকে, সেটিও ফিরিয়ে দেন বিনয়ের সাথে। এতেই বোঝা যায়, গড়নে ছোটখাটো হলেও মননে বিশাল মাপের শিল্পী ছিলেন ।
আমানুল হকের মৃত্যুতে সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় লিখেছিলেন, 'পরিবারের একজন সদস্য হারালাম'। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল তিনি পৃথিবীর মায়াত্যাগ করেন। কিংবদন্তি এই আলোকচিত্রীর মৃত্যুবার্ষিকীতে অর্পণ করছি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
/এএম