×
Logo

বিনোদন

সালমান খানের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের কী দ্বন্দ্ব, কীভাবে গ্যাংস্টার হয়ে উঠলেন তিনি?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০১ পিএম

সালমান খানের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের কী দ্বন্দ্ব, কীভাবে গ্যাংস্টার হয়ে উঠলেন তিনি?

ভারতীয় গ্যাংস্টার ও অপরাধী চক্র ‘বিষ্ণোই গ্যাং’-এর প্রধান লরেন্স বিষ্ণোই। যার আতঙ্কে গত কয়েক বছর ধরে আড়ষ্ট উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউড। মুম্বাইয়ের হিন্দি ভাষার সিনেমার সুপারস্টার 'ভাইজান' খ্যাত সালমান খানকে হরহামেশাই হুমকি দিয়ে সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেয় এই বিষ্ণোই গ্রুপ। সম্প্রতি আরেক বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের উপর হামলা করে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এই গ্যাং। 

প্রশ্ন উঠতে পারে— কে এই লরেন্স বিষ্ণোই? এমনকি তার গ্যাংস্টার হয়ে ওঠার নেপথ্যের গল্পই বা কী? পাশাপাশি সালমান খানের সঙ্গেই বা তার দীর্ঘ বৈরিতার সূত্রপাত হয়েছিল ঠিক কীভাবে? মাঝে মাঝেই তা খবরের শিরোনামই বা হয় কেন? 

মূলত, ভারতের পাঞ্জাব পুলিশের ধাওয়া খেয়ে একসময় ঘরছাড়া হতে হয়েছিল গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইকে। সেই ধাওয়া তাকে প্রথমে টেনে নিয়ে যায় রাজস্থানের রাজধানী শহর জয়পুরে।

সেখানেই এই লরেন্স বিষ্ণোই ক্যাম্পাস রাজনীতির হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে তিনি জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়। পরে রাজস্থানের এক প্রভাবশালী চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে তার নামে। যোধপুর জেলে বন্দি হন তিনি। সেই জেলেই তার পরিচয় হয় বর্তমান ‘বিষ্ণোই’ সম্প্রদায়ের বন্দিদের সঙ্গে। গড়ে তোলের অপরাধের এক বিশাল নেটওয়ার্ক।

২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি একটি হত্যা মামলার সূত্র ধরে লরেন্সকে যোধপুরের একটি আদালতে হাজির করা হয়। কাকতালীয়ভাবে, একইদিনে কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলার শুনানির জন্য ওই আদালত চত্বরে উপস্থিত ছিলেন বলিউড সুপারস্টার সালমান। সেদিনই প্রথমবারের মতো সালমান খানকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন বিষ্ণোই।

তবে, সময়ের মিলটা নেহাতই কাকতালীয় হলেও, যে শত্রুতার জেরে আজও সালমান খানকে কঠোর নিরাপত্তায় থাকতে হচ্ছে এবং এরই সূত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, এর সূচনা হয়েছিল আরও বহু বছর আগে। ভাগ্য ও লোভের বশবর্তী হয়ে বিষ্ণোইয়ের পাঞ্জাব থেকে রাজস্থানে পা রাখার মাধ্যমেই মূলত এই সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। 

আজ থেকে ২৮ বছর আগের ঘটনা। ১৯৯৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবরের মধ্যে যখন যোধপুরের কাছে সালমান খান কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেন বলে অভিযোগ ওঠে, তখন লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বয়স ছিল মাত্র  ৫ বছর। সে সময় তিনি পাঞ্জাবের ফাজিলকা জেলার একটি গ্রামে বাস করতেন।

সবশেষ দশকের বেশি সময় ধরে বিষ্ণোই বারবার এই অভিনেতাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, কারণ রাজস্থানের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ অত্যন্ত পবিত্র।  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ সালমানের নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং অভিনেতার বান্দ্রার বাসভবনের বাইরে অস্ত্র জোগাড় ও নজরদারিসহ বিভিন্ন ঘটনায় বিষ্ণোইয়ের সহযোগীদের গ্রেফতার করেছে। 

২০২৪ সালে এনসিপি (ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি) নেতা বাবা সিদ্দিকীকেও হত্যা করে বিষ্ণোই গ্যাং। অভিযোগ রয়েছে, সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং মুম্বাইয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেই এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ২০১৩-১৪ সাল পর্যন্ত এই পাঞ্জাবভিত্তিক গ্যাংস্টারের অপরাধের জাল কেবল ছাত্ররাজনীতি, ক্যাম্পাসের সহিংসতা এবং পাঞ্জাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানা যায়। এমনকি রাজস্থানে তার সাম্রাজ্য বিস্তার এবং সালমান খানকে কেন্দ্র করে তার অন্ধ জেদের সূচনা হয় ২০১৪ সালে, যখন তিনি পাঞ্জাব পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পলাতক আসামি হিসেবে প্রথম প্রবেশ করেন ওই রাজ্যে। পুলিশের কাছে দেওয়া লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ৩৫ পাতার জবানবন্দির সূত্রে উঠে এসেছে তার অপরাধ জীবনের অজানা এসব তথ্য। 

১৮ বছর আগে, ২০০৮ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থীকে মারধরের অভিযোগে লরেন্স বিষ্ণোই প্রথম গ্রেফতার হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় তার নাম আসে এবং তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কেবল রাজ্যের কলেজগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন লরেন্স। এমনকি তার জীবনের দ্বিতীয় খুনও (২০১৪ সালে) প্রথমটির মতো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাজনীতিরই রেষারেষির ফল ছিল।

একের পর এক হত্যা ও সহিংসতার একাধিক মামলার কারণে বিষ্ণোইয়ের পক্ষে আর পাঞ্জাবে থাকা সম্ভব হয়নি। তাই পুলিশের নজর এড়াতে তিনি পালিয়ে রাজস্থানে চলে যান। নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, লরেন্স ২০১৪ সালের শুরুর দিকে প্রথমে জয়পুরে পালিয়ে যান এবং সেখানে তিন-চার মাস অবস্থান করেন। তখন তার এক বন্ধু রবীন্দ্র পুনিয়া নিয়মিত তার খরচের জন্য টাকা পাঠাতেন। 

এ ছাড়া পুনিয়ার মাধ্যমেই অমদীপ ওরফে সনু নামের এক মদের দোকান মালিকের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের পরিচয় হয়। অমদীপ বিষ্ণোইয়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র; কারণ তিনিই বিষ্ণোইকে ক্যাম্পাস রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে অস্ত্র ও মদের ব্যবসার দুনিয়ায় প্রবেশ করান। 

২০১৪ সালের কোনো এক সময়ে রাজস্থানের মদ মাফিয়াদের হাতে অমদীপ খুন হওয়ার পর বিষ্ণোই তার গ্যাংকে রাজস্থানে প্রসারিত করেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন। তার জবানবন্দিতে এই সময়ে অন্তত দুটি প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিষ্ণোই ও তার সহযোগীরা অমদীপ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ধন্না ও খান পহেলওয়ানসহ তিনজনকে হত্যা করেন। বিষ্ণোইকে জিজ্ঞাসাবাদকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, এই সময়কালেই তিনি রাজস্থানের আরও অনেক অপরাধীর সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছিলেন। 

এর ২ বছর পর তার এই সহযোগীরাই যোধপুরের এক প্রভাবশালী চিকিৎসকের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য তার সাহায্য চায়—ঠিক যে যোধপুর জেলায় সালমানের হরিণ শিকারের মামলার বিচার চলছিল। 

২০১৭ সালের মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই বিভিন্ন রাজ্যে গ্যাংয়ের সদস্য রয়েছে এমন একজন সুপরিচিত গ্যাংস্টার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ওই বছরের শুরুর দিকে ফরিদকোট জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় যোধপুরের দুজন ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা যোধপুরের এক বিশিষ্ট চিকিৎসকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে চাঁদা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। সেই বছরের আগস্ট মাসে যোধপুর পুলিশ বিষ্ণোইকে গ্রেফতার করে যোধপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠায়। এই কারাগারেই তিনি মূলত পাচার সংক্রান্ত মামলায় বন্দি থাকা বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে একই সেলে সময় কাটিয়েছেন। 

রাজ্যের পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, যোধপুর জেলে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে আলাপচারিতাই তাকে বিষ্ণোই সমাজের ‘আন্দোলন’ বা স্বার্থরক্ষার ছদ্মবেশে এই কাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে। তাছাড়া, ২০১৭ সালের আগস্টের দিকে তার এই কারাবাস যোধপুরের স্থানীয় আদালতে সালমান খানের মামলার শেষ ধাপের শুনানির সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল। 

লরেন্স বিষ্ণোইয়ের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তাকে কড়া নিরাপত্তার জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই তিনি যোধপুরের ব্যবসায়ী বাসুদেব ইরানিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন; যে মামলায় রাজস্থান পুলিশ তাকে আবারও গ্রেফতার করে। এই মামলাটিই তাকে পুনরায় যোধপুরে ফিরিয়ে আনে এবং কয়েক মাস পর তাকে ঠিক সেই একই আদালত চত্বরে নিয়ে আসে, যেখানে সালমান খান উপস্থিত ছিলেন। 

একই সময় যোধপুর আদালত নিয়মিত সালমান খানের মামলার শুনানি পরিচালনা করছিল। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি ইরানি হত্যা মামলার শুনানির জন্য তাকে যোধপুরে আনা হয়, ঠিক যে দিনটিতে কৃষ্ণসার হরিণ মামলার সমাপনী যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য সালমান খানও আদালত চত্বরে এসেছিলেন।

যোধপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে সালমানের শুনানি কভার করতে আসা সাংবাদিকদের সামনে সেদিনই প্রথম প্রকাশ্যে লরেন্স বিষ্ণোই সালমান খানকে হত্যার হুমকি দেন। পুলিশ জানায়, আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সালমান খানকে দেখে বিষ্ণোই হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, সালমান খান কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করা সত্ত্বেও আদালত থেকে কোনো শাস্তি পাননি, যা বিষ্ণোই সম্প্রদায়কে গভীরভাবে আহত করেছে।

মূলত, কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করে পরে চণ্ডীগড়ের ডিএভি কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে আসা লরেন্স বিষ্ণোই শুধু ভারতেই নয়, বরং আমেরিকা ও কানাডায়ও আলোচিত অপরাধীদের একজন। বর্তমানে গুজরাট উপকূল থেকে মাদক পাচার চক্র পরিচালনার মামলায় লরেন্স বিষ্ণোই সাবরমতী জেলে বন্দি।

শুধু সালমানই নন, চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেট্টির মুম্বাইয়ের জুহুতে অবস্থিত বাড়িতে ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভোরের দিকে গুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল আমোল বিষ্ণোইয়ের, যিনি সম্পর্কে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই।

/এমএইচআর

Logo