×
Logo

বিনোদন

আনোয়ার হোসেন: বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা আলোকচিত্রী

সাইফুল আমিন কাজল

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ পিএম

আনোয়ার হোসেন: বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা আলোকচিত্রী

আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন। ছবি: সাইফুল আমিন কাজল

১৯৮১ সালে 'সূর্য দীঘল বাড়ী' সিনেমার ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ। সেখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মন্তব্যটি ছিল এমন– "এই ছবিতে ক্যামেরা কাজ করে জীবন্ত শিল্পীর মতো। মনে হতে পারে যে, ক্যামেরাকে অগাধ স্বাধীনতা দিয়ে পরিচালকরা বসেছিলেন অনেক পেছনে। একটির পর একটি দৃশ্য সাজানো হয়েছে, পরিচালকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। পেছনে বসে খুব শক্ত ও পরিশ্রমী এবং সর্বোপরি সৃজনশীল হাতে নিয়ন্ত্রণ না করলে ক্যামেরার স্বতঃস্ফূর্ততা এভাবে অনুভব করা যেত না।"

ক্যামেরার পেছনের পরিশ্রমী অথচ সৃজনশীল মানুষটি ছিলেন আনোয়ার হোসেন; যার নিপুণ হাত আর কুশলী চোখের সুবাদে সমৃদ্ধ হয়েছে দেশের চলচ্চিত্র। 'সূর্য দীঘল বাড়ী' (৭৯), 'এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী' (৮০), 'পুরস্কার' (৮৩), 'সুরুজ মিয়া' (৮৪), 'দহন' (৮৫), 'নদীর নাম মধুমতি' (৯৪), 'চিত্রা নদীর পারে' (৯৯), 'অন্য জীবন' (৯৫), 'লালসালু' (২০০১), 'লালন' (২০০৪) তার উল্লেখযোগ্য কাজ। আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরা কথা বলেছে 'হুলিয়া' (৮৪), 'চাকা' (৯৩)-এর মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও। রয়েছে 'অয়ি যমুনা' (২০০২), 'স্বপ্নভুমি' (২০০৭), 'বস্ত্রবালিকা’র মতো তথ্যচিত্র।

শুরুতে আখতারুজ্জামানের কথাগুলোর সত্যতা মেলে চট্টগ্রামের নির্মাতা ও চট্টগ্রাম সত্যজিৎচর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, আনোয়ার হোসেনের স্নেহধন্য বন্ধু আনোয়ার হোসেন পিন্টুর স্মৃতিচারণে। চট্টগ্রামে শুটিং হওয়া এক সিনেমায় কোনো চিত্রনাট্য বা সংলাপ ছিল না। আনোয়ার হোসেন ক্যামেরায় তো ছিলেনই, পাশাপাশি পরিচালকের পুরো দায়িত্বও তিনি পালন করে যাচ্ছিলেন। দৃশ্য কেমন হবে, ডায়ালগ কী হবে ইত্যাদি। রোজিনা সেই সিনেমার নায়িকা ছিলেন। শুটিং দেখতে গিয়ে তিনি এই অভিজ্ঞতা স্বচক্ষে দেখলেন।

"বাংলাদেশের আলোকচিত্র যে কয়েকজন আলোকচিত্রীর কাজের মধ্য দিয়ে সাবালকত্ব অর্জন করেছিল, আনোয়ার হোসেন তাদের মধ্যে সম্ভবত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অর্জন অনেক। কিন্তু বোধকরি পুরস্কার অর্জনের থেকেও তার সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের আলোকচিত্রে তার কাজের প্রভাব। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তার কাজ প্রভাবিত করেছে সকল প্রজন্মের আলোকচিত্রীদের এবং সেই প্রক্রিয়া এখনও চলমান।" (সাইফুল হক অমি, মুনেম ওয়াসিফ/কাউন্টার ফটো ১/২০০৪)

১৯৬৭ সালে জীবনের প্রথম ক্যামেরায় প্রথম দিনের তোলা একটি ছবি দিয়েই পুরস্কার জেতেন আনোয়ার হোসেন। 'ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব'-এর কনটেস্টে দ্বিতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি। জীবনে অনেক পুরস্কার জিতেছেন, দেশের সম্মান উজ্জ্বল করেছেন বহুবার। '৭৮ সালের কমনওয়েলথ (কানাডায়) কনটেস্টে ৯টির মধ্যে ৬টি পুরস্কারই তিনি একাই জিতে নেন। বাংলাদেশ দেশ হিসেবেও আরো একটি পুরস্কার পায়। পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল– কমনওয়েলথে বাংলাদেশের জয় জয়কার। তখনও বা পরেও খেলাধুলাতে এত পুরস্কার জেতেনি বাংলাদেশ, আলোকচিত্রে যতটা জিতেছে। সেবার বিচারক ছিলেন বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী ইউসুফ কারশ। পরের বছর আনোয়ার হোসেনকে একক জাজ হিসেবে সম্মান দেয়া হয়। তার বয়স তখন মাত্র ৩২। এই বয়সে এমন সম্মান এর আগে কেউ পাননি।

May be a black-and-white image
 আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ছবি 

অথচ অনেকে হয়ত জানেন না, জীবনের শুরুতে তিনি চিত্রশিল্পী হবার স্বপ্ন দেখতেন। শিশুকলা ভবনে ভর্তিও হয়েছিলেন, দুবার জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন ছবি এঁকে। ষাটের দশক তখন। উৎসাহ না পেয়ে ছবি আঁকা বাদ দিয়ে পড়ায় মন দিলেন, এসএসসিতে ফিফথ স্ট্যান্ড করলেন। ভর্তি হলেন নটরডেমে, ৬৭ সালে পাশ করে বেরিয়ে বুয়েট। কলেজে স্কলারশিপের টাকা দিয়ে ক্যামেরা কিনে ফেলেন বন্ধুর কাছ থেকে, ৩০ টাকায় কেনা সেটি ছিল আগফা ক্লাক বক্স ক্যামেরা। বুয়েটে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত ক্লাসে প্রথম হয়েছেন। ছবি তোলার নেশায় বুদ থাকায় মোটামুটি ভাল রেজাল্ট নিয়ে পাশ করে বেরুলেন। এরপর ৭৪ সালে স্কলারশিপ নিয়ে পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে ডিপ্লোমা করতে চলে গেলেন। দেশে ফিরেই 'সূর্য দীঘল বাড়ী', 'এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী'তে কাজ শুরু করেন।

আনোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৪৮ এর ৬ অক্টোবর, পুরান ঢাকার আগানবাব দেউড়িতে। তাজমহল সিনেমা হলের ঠিক পেছনে (হলটি এখন আর নেই)। টোকাইদের মতো করে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে ছোটবেলায় বস্তায় কাঠের চুরণ (কাঠের গুঁড়ো/ভূষি) ভরে আট আনায় বিক্রি করেছেন। আরমানিটোলা স্কুলে বরাবর ফাস্ট হতেন ক্লাসে। বাবার সূত্রে এলাকার তাজমহল আর শাবিস্তান হলে সিনেমা দেখতেন ফ্রিতে। ধারাপাত, জাগো হুয়া সাবেরা, সুতরাংসহ ইংরেজি সিনেমাও সেখানে দেখানো হত। এসব দেখতে দেখতেই ছবি তোলার আগ্রহটা জন্ম নেয়।

রঘু রাই, কার্টিয়ে ব্রেসো, সেবাস্তিয়াও সালগাদো, ইউসুফ কারশ, আব্বাস আত্তারদের সাথে আনোয়ার হোসেনের সুসম্পর্ক ছিল। বিদেশি সংস্থার ভালো অফার ফিরিয়েছেন দেশ ছেড়ে যেতে মন টানেনি বলে। একটা সময়ে এসে পুরস্কারের পেছনে সময় ব্যয় করা পুরাপুরি ছেড়ে দেন। আপন মনে বাউলের মত ঘুরে বেড়িয়েছেন আর ছবি তুলেছেন।

৯৩ সালে আনোয়ার হোসেন স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ফ্রান্সে। এরপর প্রায় প্রতি বছরই দেশে বেড়াতে আসতেন। দেশের প্রতি অভিমান নিয়েই সেচ্ছানির্বাসন বেছে নেন। কারণ হিসেবে এক  সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই আছেন, যারা সিনেমার সাথে দেশও নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের জন্যই আজ আমি ফ্রান্সে এবং সেই দেশের নাগরিক।

পত্রপত্রিকা ও নানা প্রকাশনায় বিশেষ করে বিজয় দিবসে সরকারি ক্রোড়পত্রে ক্রেডিট ও সম্মানী ছাড়া তার ছবির অহরহ ব্যাবহার নিয়ে মনঃক্ষুণ্ণ ছিলেন। 'অন্যজীবন' সিনেমায় সেরা চিত্রগ্রাহকের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে ইমেইল ও পত্রিকায় বার্তা পাঠান, সেটা তারা ছাপেনি। 'লালসালু' সিনেমাতে পুরস্কার পাবার খবর তাকে জানানোই হয়নি এবং তার অজান্তেই এফডিসির একজন পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। পুরস্কার-সম্মাননা এসবের প্রতি কখনোই আগ্রহী ছিলেন না আনোয়ার হোসেন।

'৯১ সালে স্ত্রী ডলি আনোয়ারের মৃত্যুর পর ৫ বছর পাগলের মতো ঘুরে বেড়ান ইউরোপ-আমেরিকা। '৯৬ সালে ফ্রান্সের মরিয়ামকে বিয়ে করেন। দুই ছেলে আকাশ ও মেঘদূত। ২০০৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে এই আলোকচিত্রী বলেন, ছেলে দুটির বয়স ১৮ হলে আমি হয়ত বেঁচে থাকব না, কিন্তু তারা বাবার সিল করা খাম পাবে। তাতে অন্যান্য রোজনামচার মধ্যে এই লেখাটির ফরাসি অনুবাদ এবং একটি কথা– 'তাদের বাবার মাতৃভুমি বাংলাদেশ'।

সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ৫বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। দেশের ইতিহাসের সেরা ১০টি সিনেমার মধ্যে পাঁচের অধিক সিনেমার ক্যামেরা কথা বলেছেন তার হয়ে। বাংলাদেশের সেরা আলোকচিত্রী ও সেরা সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। আধুনিক স্ট্রিট ফটোগ্রাফির অন্যতম জনক হিসেবেও অনেকে তাকে সম্মান জানান।

May be a black-and-white image of one or more people
ভাবুক আনোয়ার। ছবি: সাইফুল আমিন কাজল

বাংলাদেশ আলোকচিত্র ফেডারেশন করেছিলেন ১৯৮৭ সালে, মহাসচিব ছিলেন তিনি। ৯৩ সাল পর্যন্ত এটির কার্যক্রম ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সোসাইটি ফেডারেশনের সহসভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (বিপিএস) আজীবন সদস্য, বিপিএস নিউজলেটারের সম্পাদক ছিলেন ১৯৮৬-৮৮ সময়ে। নিজের সম্পাদিত ‘আয়না’ ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যা হয়েছিল মাত্র। এছাড়া পদ্মা প্রিন্টার্সে আলোকচিত্রী হিসেবে এক বছর কাজ করেন (১৯৭৯ সালে), ৮৯-৯১ সময়ে সাপ্তাহিক ‘ডায়ালগ’-এর চিত্র সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।

আনোয়ার হোসেনের প্রিয় আলোকচিত্রী– দেশে আমানুল হক, নাইব উদ্দিন আহমেদ, হাসান সাইফুদ্দিন চন্দন। বিদেশে রঘু রাই, সুনীল জানা, কার্টিয়ে ব্রেসো, সেবাস্তিয়াও সালগাদো। সবার ওপরে যার কাজকে সম্মান করতেন, তিনি হলেন ইউজিন স্মিথ।

আনোয়ার হেসেনের জীবন—
সিনেমাটোগ্রাফি: ৪০ বছর (১৯৭৮-২০১৮)
ফটোগ্রাফি: ৫০ বছর (১৯৬৭-২০১৮)
সিনেমা: ১৫টি (চিত্রগ্রাহক ও স্থির চিত্রগ্রাহক)
শর্টফিল্ম/ডকুমেন্টারি: ৩০টি
ফটোগ্রাফির বই: মোট ৯টি

আনোয়ার হোসেন এ দেশে তার প্রাপ্য সম্মান পাননি। এর কারণ কী, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক অপ্রিয় সত্য কথা চলে আসে। দেশের হয়ে কাঁধে রাইফেল তুলেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৭১ ও পরবর্তী সময়ে অসংখ্য ছবি তুলেছেন। তার মোট কাজের ২৫ ভাগ মাত্র প্রকাশিত, নিজেই বলতেন সবসময়। সেইসব অপ্রকাশিত ছবি নিয়ে কয়েকটি বই প্রকাশের চেস্টা করেছিলেন; শেষবার যখন এলেন, তখনও।

একজন আনোয়ার হোসেন হাজার বছরে একবার জন্ম নেন। আনোয়ার হোসেন বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। এই মহান শিল্পীর জন্মদিনে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

/এএম 

Logo