গাজায় এআই ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে চলচ্চিত্র, ভেনিসে ২৫ মিনিটের 'স্ট্যান্ডিং অভেশন'
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
গাজায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে নির্মিত ইসরায়েলি চলচ্চিত্র ‘নাজা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রদর্শনী শেষে প্রায় ২৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্রটির নির্মাতাদের অভিবাদন জানান দর্শকরা।
৮০ মিনিটের তথ্যচিত্রটি, নির্মাণ করেছেন, ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোয়ার। ২০২৫ সালে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের জন্য অস্কার জেতেন তারা।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে নির্মিত ওই চলচ্চিত্রে তাদের সঙ্গে সহ-পরিচালক হিসেবে ছিলেন ফিলিস্তিনি নির্মাতা বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লাল।
প্রায় তিন বছর ধরে অনুসন্ধানের পর নির্মিত হয়েছে ‘নাজা’। চলচ্চিত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন সদস্যের সাক্ষাৎকার।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা নির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কণ্ঠ ও চেহারা প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে। তেলআবিবের বাড়ির ছাদে রাতের আঁধারে ধারণ করা হয়েছে এসব সাক্ষাৎকার।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে ইউভাল আব্রাহাম বলেন, তারা এমনভাবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে চেয়েছেন, যাতে ইসরায়েলি সেনা ও কর্মকর্তারাই গাজায় তাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সরাসরি কথা বলেন।
তিনি বলেন, গাজায় হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় ব্যবহৃত ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করত এবং সেগুলো কীভাবে পরিচালিত হতো, যতটা সম্ভব বিস্তারিতভাবে সেটিই তুলে ধরাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
‘নাজা’ নামটি নিজেই একটি হিব্রু গোয়েন্দা পরিভাষা। কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য কতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারেন, সেই সংখ্যাকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় বলে চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যচিত্রটিতে ‘ল্যাভেন্ডার’ নামে এআই অ্যাসিস্টেড একটি ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রের সাক্ষাৎকারদাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার নজরদারির আওতায় থাকা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, মানুষের চলাচল ও পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যার জন্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো।
একজন সাক্ষাৎকারদাতা জানান, গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল কারখানায় ব্যাপক হারে উৎপাদনের মতো। আর লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার সঙ্গে জড়িত আরেকজন এটিকে 'ভিডিও গেমের' সঙ্গে তুলনা করেন।
তার ভাষ্য, সবকিছু দূর থেকে পরিচালিত হওয়ায় বিষয়টি অনেকটা ভিডিও গেম খেলার মতো ছিল এবং সেটিকে তিনি ‘অবিশ্বাস্য রকম মজার’ বলেও বর্ণনা করেন।
চলচ্চিত্রটিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও সামরিক সূত্র বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন উপেক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ‘ঘৃণার পরিবেশ’ নিয়েও কথা বলেছেন।
তাদের দাবি, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতেন যে যেসব বাড়িকে তারা হামলার লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করছেন, সেগুলোর ভেতরে পরিবারসহ বেসামরিক মানুষ অবস্থান করছিলেন। এ বিষয়ে তারা নিজেদের চোখে ও কানে প্রমাণ দেখেছেন এবং শুনেছেন বলেও জানান।
ইউভাল আব্রাহাম আশা প্রকাশ করেছেন, চলচ্চিত্রটি পশ্চিমা দেশগুলোকে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন পুনর্বিবেচনা করতে এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির ওপর চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের ভেতরে যারা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলো কোনো পদক্ষেপ 'না' নিলে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলিদের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আব্রাহাম ও সোয়ার দাবি করেন, তাদের অনুসন্ধানের ফাইনাল বার্তা হলো, গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষদের হত্যা হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো ‘দুঃখজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ ছিল না; বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও হিসাব করে নেওয়া একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনেও প্রশংসা এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক চলচ্চিত্রবিষয়ক বাণিজ্য সাময়িকী ‘স্ক্রিন ইন্টারন্যাশনাল’ ‘নাজা’কে জরুরি ও গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার মতো চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার’ চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অপমানবোধ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছে।
চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা করেছেন যুক্তরাজ্যের জিম উইলসন। প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন জোনাথন গ্লেজার। ২০২৪ সালে ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জেতা দলেরই অংশ তারা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে প্রায় ৭৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য। এ সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশও সীমিত রাখা হয়েছে।
এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে একমাত্র তথ্যচিত্র ‘নাজা’। শনিবার উৎসবের সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে, গত বছর ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ চলচ্চিত্রটি ভেনিসে ২৩ মিনিটের 'স্ট্যান্ডিং অভেশন' পেয়েছিল। পরে চলচ্চিত্রটি উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করে।
/এআই