×
Logo

বিনোদন

রাজীব আশরাফে 'হোক কলরব'

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

রাজীব আশরাফে 'হোক কলরব'

আল মাহফুজ

'কুয়োর তলে ভীষণ জলে খাল না হয়ে ঝিল হলো ক্যান

ধুত্তরি ছাই মাছগুলো তাই ফুল না হয়ে চিল হলো ক্যান
হোক কলরব, ফুলগুলো সব লাল না হয়ে নীল হলো ক্যান?'

এই শব্দরাজি প্রথম যখন কান থেকে মনে ভেসে আসে, মনে পড়ে যায় বিনয় মজুমদার। মাছ, কুয়ো, সারস ইত্যাদি সাবজেক্ট ম্যাটার দিয়ে বিনয় মেটাফিজিক্যাল প্রগাঢ় কিছুর ইঙ্গিত দিতো। রাজীব আশরাফও হয়তো সেই পথের পথিক। তার ব্যবহার করা উপমা বা মেটাফোরগুলোর অর্থ দাঁড় করাতাম নিজের মতো করে। আমার কাছে মনে হতো, সাদা-কালো আখর দিয়ে রাজীব হয়তো সজীব কিছু বুঝাতে চেয়েছেন। কখনও মনে হতো, মানবজীবন সম্পর্কে আত্ম-জিজ্ঞাসার নির্যাস আছে তাতে। আবার কখনও প্রশ্ন জাগতো, এই মহাবিশ্বের কোথাও কি তা অস্তিত্বশীল?

গান যখন আন্দোলনের হাতিয়ার

২০১৪ সালে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় 'হোক কলরব' আন্দোলন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনে এক ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগের যথাযথ মর্যাদা দেয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচারের দাবি নিয়ে 'হোক কলরব' স্লোগানে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।

তিনদিন পর হঠাত মধ্যরাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ নেমে আসে। সংঘর্ষে গুরুতর জখম হয় ছাত্রছাত্রীরা। গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ায় তা সম্প্রচারিত হলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলন বেগবান হয়। ঢেউ আছড়ে পড়ে ছাত্রসমাজে। দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু– নানা শহরে। ঢেউয়ের আঁচ লাগে দেশের বাইরেও। 'হোক কলরব' ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী। রাজীবের লেখা এই শব্দবন্ধটি বনে যায় ছাত্র আন্দোলনের শাশ্বত স্লোগানে।

অখ্যাত রাজীবের কাছে অসংখ্য ফোনকল আসে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় লিরিকের নিহিতার্থ। রাজীব অগণিত ছাত্রছাত্রীর অনুভূতির গ্রাফিতিকে সম্মান জানান। গানের অন্তরালের গল্প খোলাসা করেন না।

Jadavpur university: রাজ চক্রবর্তীর সিনেমা 'হোক কলরব' নিয়ে আপত্তি যাদবপুরের
'হোক কলরব' ঢেউ তোলে ছাত্রসমাজে

ফরমায়েশি লিরিক থেকে 'কঠিন' কবিতা

ফরমায়েশি লিরিক লিখতে রাজীব পছন্দ করতেন না। তার কবিতা থেকে তখন একের পর এক গানের খোলতাই হচ্ছে। সেসব গান কণ্ঠে ধারণ করছেন অর্ণব, আরাফাত মহসিন, পলবাসারা। কিন্তু আপাদমস্তক 'কবি' রাজীব ফরমায়েশি লেখা লিখতে চান না। তার চাই নিজের মতো করে কবিতা। যে কবিতা স্পেসিফিক একটি মোমেন্টে কেবল একজন পাঠকই পড়বে। পাঠক তার নিজের কল্পনায় উপমা, উৎপ্রেক্ষাগুলো নিয়ে ছবি আঁকবে। এই ভেবে রাজীব হলেন দৃঢ়সংকল্প। নিজের লেখায় সহজ বা নরম শব্দ উপেক্ষা করে গেলেন। তুলনামূলক কঠিন শব্দ দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলেন, যাতে কেউ সুর দিয়ে সেগুলোকে গানে রূপান্তরিত করতে না পারে। একদা পূরণ হলো তার স্বপ্নের কিয়দাংশ। প্রকাশিত হলো কবিতার বই 'ধরেছি রহস্যাবৃত মহাকাল'। রাজীব কি মহাকালের রহস্য শেষ পর্যন্ত ভেদ করতে পেরেছিলেন? নাকি নিজেই রহস্যের আবরণে মিশে গেলেন, যেভাবে উড়ে যায় পাখি ডানার অসুখে? 'পুনর্জন্ম' কবিতায় তার কিছুটা ইঙ্গিত দেন কবি–

'ফেরারি চাঁদের মতো পৃথিবীতে এসে
স্মৃতিহীন পথিকের প্রতিটা পথই নতুন'

সময়ের আবর্তনে 'আইসক্রিম' সিনেমার 'বোকা চাঁদ' গানটি যেদিন শোনা হলো, মস্তিষ্কে শোরগোল তুললো– এই গান আলবত রাজীবের লেখা। অর্ণব যতোটা আদর দিয়ে গানটা কণ্ঠে তুলেছেন, তার চাইতে আরও আদর দিয়ে শব্দগুলো সাজিয়েছেন বোহেমিয়ান কবি। ওই গানের নিছক দুটো লাইন শুনেই আমার সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া– 'বিবর বিশুষ্ক মায়ায়, নিশুন্য হাওয়ায় হাওয়ায়..'

রাজীব আশরাফে 'হোক কলরব'

রাজীব আশরাফ কত বড় মাপের কবি ছিলেন, তা বিচার করবেন পরিণত পাঠক। 'গীতিকার' ও 'গীতিকবি'র মধ্যকার যে সূক্ষ্ম ফারাক, সেই আলোচনা অন্য কোনো দিন। আজ শুধু এতোটুকু বলতে চাই, রাজীব আশরাফরা কি পর্যাপ্ত স্পেস পান? গণমাধ্যম কি রাজীবদের কথা মনে রাখে? না রাখলেও হয়তো ক্ষতি নেই। কারণ, রাজীব হয়ে গেছেন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সমার্থক শব্দ। রাজীবকে মনে রাখে অগুনতি ফুটপাত, শহরের কাঁধে যখন সন্ধ্যা ভর করে।

রাজীবকে মনে রাখে ঢাবির চারুকলা। মনে রাখে জাবির প্রাঙ্গণ, হয় 'রাজীব উৎসব'। আপনি ছবি চত্বরের সিঁড়িতে বসে হয়তো রাজীবের দেখা পাবেন, হয়তো পাবেন না। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী কিংবা এই মিথ্যে কথার শহর ছেড়ে আপনি একটু রাজীবের জন্য হাঁটুন। অতিক্রান্ত পথ হয়তো আপনার অচেনা মনে হবে না..

গীতিকার ও নির্মাতা রাজীব আশরাফ। ছবি: সংগৃহীত
রাজীব আশরাফ (১৭ ডিসেম্বর ১৯৮২- ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩)

১ সেপ্টেম্বর রাজীবের চলে যাওয়ার দিন। ২০২৩ সালের এই দিনে ৩৮ বছর বয়সে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় নিভে যায় এই অনন্য প্রতিভার জীবনপ্রদীপ। রাজীব আশরাফ নেই, তিন বছর হয়ে গেল!

লেখাটা শেষ করছি কবি পিয়াস মজিদের 'রাজীব' কবিতা দিয়ে—

'দুনিয়া তো এলিজির নর্দমা
আমি আমার চোখের ময়লা পানি সাঁতরায়ে
আপনারে ডাকতে চাইছি নীলফুলের মিউজিকে।
আপনি বস কই কই চইলা যাচ্ছেন!
দ্বিধার মনস্ক দোকান খোলা রাইখা
আমাদের অপকল্পনার ঠাঁটবাটের সঙ্গে লেবু না মিশাইয়া
আপনি মরণের চুমার দিকে গাল বাড়াইয়া দিতেছেন!
আরে, ০১টা ঘন আড্ডার অভিশাপ মুলতবি রাইখা
নতুন নতুন নরকের জন্ম না দেইখা
তামাম শহরের নিস্তব্ধতায়
এই শুক্রবার দুপুরে আপনি
ছড়াইয়া দিয়া গেলেন
এত কেজি এতিম কলরব!'
 

Logo