আল মাহফুজ ⚫
তুমি কখনও শিয়রে অনুভব করেছ পাতার গান জলের তান? একাকি দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে শুনেছ হামিংবার্ডের ডানার ঝাপ্টা? অথবা বাজিয়েছ অরফিউসের মতো বার্মিজ বীণা, যার স্পর্শে বেড়ে ওঠে লালচে নীলচে ফুল..
সিনেমার নাম 'বার্মিজ হার্প'। হার্পের বঙ্গানুবাদ করা যাক বীণা। যে যন্ত্রের সরল বাদন কানে ঢুকলে মনের আর্দ্রতা, শুভ্রতা যেন নদীর জলের মতো বয়ে যায়। যে যন্ত্রের মোহন তরঙ্গে কেঁপে ওঠে হিমবাহ অমামুলি মূর্ছনায়।
প্রিয় সিনেমার ফর্দের তো শেষ নেই। কিন্তু অবিস্মরণীয় সিনেমার প্রসঙ্গ উঠলে! এই ছবি তেমন প্রিয়, তেমন 'অবিস্মরণীয়'। বার্মিজ হার্প একটি আধ্যাত্মিক ছবি। স্পিরিচুয়ালিটির পূর্ণতা পেয়েছে এর অনুপম সংগীতের পথে। এই ছবির সুরেলা বাহনে আমি যে ক'বার চড়ে উঠি, প্রতিবার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। বীণার বাদনে সুরের প্রশান্তি এখানে এতোটাই প্রগাঢ় যে, অজান্তে চোখে অশ্রু ভর করে। সিনেমার নামকরণের যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। 'বার্মিজ বীণা' জায়গা করে নেয় মনের মুকুরে।

জাপানি নির্মাতা কন ইচিকাওয়ার অন্যান্য কাজ দেখেছি। 'ফায়ারস অন দ্য প্লেন' তার আরেকটি ভালো কাজ। টোনের দিক থেকে বার্মিজ হার্পের বিপরীত হলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা সেখানেও বহমান। কিন্তু 'বার্মিজ হার্প'কে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই ডিরেক্টর, কাছাকাছি পৌঁছতে পারেনি তার অন্য কোনো সৃষ্টিকর্ম।
সারসংক্ষেপে বার্মিজ হার্পের গল্প হল— বার্মায় যুদ্ধরত জাপানি সেনাদল বিগ্রহ শেষে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু 'মিজুসিমা' নামক এক সৈনিক ঘটনাচক্রে এক ভিক্ষুর আশ্রমে ঠাই পায়। যুদ্ধের বীভৎসতা, ভয়াবহতা দেখে ধীরে ধীরে তার ভেতরকার যে মানসিক-আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটে, সেটিই ছবিটির মুখ্য অনুষঙ্গ।
এই সিনেমা পরোক্ষভাবে যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়ায়। এই সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অস্কার সিন্ডলারের দুঃসহ কান্না। এই সিনেমার দর্শনের সাথে আমরা শহীদ কাদরীর কবিতাকে মিলেমিশে একাকার করে ফেলি..
'ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটাতার ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা!'