কান্ট্রি মিউজিকের কিংবদন্তি শিল্পী ও গীতিকার ডলি পার্টন মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন ব্রায়ান সিভার।
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ব্রায়ান জানান, পার্টন পরিবারের পক্ষ থেকে তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে ডলি পার্টনের মৃত্যুর খবর জানাচ্ছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডলির নিরাপত্তাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রায়ান বলেন, বহু বছর আগেই তার ফুফু তাকে নিজের মৃত্যুর খবর জানানোর দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন।
আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেন, ডলির মৃত্যুতে দুঃখ তাদের পরিবারের, ডলির নয়। তার ভাষ্য, ডলি সারাজীবন সংগীত নিয়েই থেকেছেন। ছোটবেলায় ডলির সঙ্গে সফরে গিয়ে তিনি প্রথমবার শিল্পীজীবনের স্বাদ পেয়েছিলেন। ডলি শুধু তার নিজের পরিবারের জন্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রজন্মের পর প্রজন্মের গায়ক, গীতিকার, সংগীতশিল্পী ও স্বপ্নবাজ মানুষের জন্যও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
তার ভাষায়, ডলি এমন কোনো দরজা দেখেননি, যা তিনি খুলতে পারেন না। আর তার খোলা সেই দরজাগুলো অনেক মানুষের জীবন ও ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, ২১ আগস্ট, নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছিলেন ডলি পার্টন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, গত বছরের মার্চে, স্বামী কার্ল ডিনের মৃত্যুর পর নিজের স্বাস্থ্যের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেননি।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কার্লের দেখাশোনা করতে গিয়ে নিজের কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যাকে তিনি গুরুত্ব দেননি। তবে জীবনে এর আগেও কঠিন স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জনের প্রসঙ্গ টেনে ডলি বলেছিলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে যেকোনো বিষয়ই আগের তুলনায় অনেক বেশি আলোচিত হয়।
তবে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পাশাপাশি কাজও চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছিলেন তিনি।
ডলি বলেছিলেন, ‘আমি এখনো শারীরিকভাবে পুরোপুরিভাবে সেরে উঠিনি। আপনারা আমাকে চেনেন—আমি প্রায়ই বলেছি, আমি নিজেই নিজেকে স্বপ্নের এক কোণে নিয়ে গেছি। এখনো আমার অনেক কিছু করার আছে। তাই যতদিন পারি কাজ করে যাব, যতক্ষণ না আমার স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নেয়।’
এই বক্তব্যের মাত্র কয়েক দিন পরই তার মৃত্যুর খবর আসে।
দারিদ্র্য থেকে বিশ্বখ্যাতির পথে
১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলি পার্টনের। ১২ সদস্যের পরিবারে ১১ ভাইবোনের সঙ্গে দারিদ্র্যের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন তিনি।
ছয় বছর বয়সে প্রথম গিটার বাজানো ও দাদার গির্জায় গান গাওয়া শুরু করেন ডলি। এর এক বছর পর থেকেই গান লেখা শুরু করেন। ছোটবেলায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবারও জুটত না।
তবে শৈশবের সেই সীমাবদ্ধতা কখনো তার স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি।
১৯৬৪ সালে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ন্যাশভিলে চলে যান ডলি। সেখানে বিভিন্ন ক্লাবে গান গাওয়ার পাশাপাশি অন্য শিল্পীদের জন্য গান লিখতে শুরু করেন। পরে কান্ট্রি তারকা পোর্টার ওয়াগনার তাকে তার জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান The Porter Wagoner Show-তে সহশিল্পী হিসেবে সুযোগ দেন।
ওয়াগনারের সহযোগিতায় রেকর্ড চুক্তি পাওয়ার পর ডলির ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রথমদিকে, তার বেশিরভাগ সাফল্য আসে ওয়াগনারের সঙ্গে গাওয়া দ্বৈত গান থেকে।
১৯৭১ সালে ‘Joshua’ দিয়ে প্রথম কান্ট্রি চার্টের শীর্ষে ওঠেন তিনি। একই বছর প্রকাশিত ‘Coat of Many Colors’ গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭৩ সালে আসে তার অন্যতম কালজয়ী গান ‘Jolene’, যা কান্ট্রি চার্টের এক নম্বরে উঠে যায় এবং বিলবোর্ড হট ১০০-তেও জায়গা করে নেয়।
‘I Will Always Love You’ বদলে দেয় সংগীতের ইতিহাস
১৯৭৪ সালে পোর্টার ওয়াগনারের টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তাকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলেন ‘I Will Always Love You’।
ওয়াগনারের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক শেষ করার মুহূর্তটি সহজ ছিল না। ডলি পরে জানিয়েছিলেন, সেই পরিস্থিতি থেকেই গানটি তার মাথায় আসে।
গানটি প্রথমে কান্ট্রি চার্টে দুইবার শীর্ষে ওঠে। তবে ১৯৯২ সালে হুইটনি হিউস্টন 'The Bodyguard' সিনেমার জন্য গানটি গাওয়ার পর এটি বিশ্বব্যাপী বিশাল জনপ্রিয়তা পায়।
হিউস্টনের কণ্ঠে নিজের গান শুনে ডলি উপলব্ধি করেছিলেন, গীতিকার হিসেবে তার প্রতিভার মূল্য কতটা। পরে তিনি বলেছিলেন, সেটিই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন নিজের উপহার হিসেবে গান লেখার ক্ষমতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।
এরপর ‘Here You Come Again’, ‘Two Doors Down’, ‘Light of a Clear Blue Morning’, ‘It’s All Wrong, But It’s All Right’ এবং ‘You’re the Only One’-এর মতো একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি।
সংগীতের পাশাপাশি সিনেমাতেও সফল
১৯৮০ সালে '9 to 5' সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় ডলি পার্টনের। লিলি টমলিন ও জেন ফন্ডার সঙ্গে অভিনীত সিনেমাটির জন্য গাওয়া শিরোনাম গানটি বিলবোর্ড হট ১০০-তে তার প্রথম এক নম্বর গান হয়।
১৯৮৭ সালে লিন্ডা রনস্ট্যাড ও এমিলু হ্যারিসের সঙ্গে প্রকাশ করেন সমালোচকদের প্রশংসিত অ্যালবাম Trio। ডলি তাদের সম্পর্ককে বোনের মতো বলে বর্ণনা করেছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মানে ভরা দীর্ঘ ক্যারিয়ার
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন পেয়েছেন ১১টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, একটি এমি, ১০টি কান্ট্রি মিউজিক অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, সাতটি অ্যাকাডেমি অব কান্ট্রি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং তিনটি আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড।
এছাড়া দুইবার অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন এবং সম্মানসূচক অস্কারও পেয়েছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে। ২০২২ সালে জায়গা করে নেন রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমেও।
বিশ্বজুড়ে ১৬ কোটিরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হওয়ায় ডলি পার্টনকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া নারী কান্ট্রি মিউজিক শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
/এআই