×
Logo

অর্থনীতি

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় কাজে লাগাতে চায় সরকার

হুমায়ুন রশীদ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় কাজে লাগাতে চায় সরকার

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। তবে বর্ধিত এই সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা কী? অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার পথরেখা এবং উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের প্রস্তুতি একই সূত্রে গাঁথা। এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা দূর করা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিসংক্রান্ত সূচকে ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশটি। তবে কোভিড-১৯ মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্ধারিত সময়ে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন করে সরকার। পরে জাতিসংঘের প্লেনারি সভায় বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সময়ের বিষয়টি অনুমোদন পায়। ফলে চলতি বছরের নভেম্বরে নয়, ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে বাংলাদেশ।

তবে বাড়তি তিন বছর সময় পেলেও সামনে রয়েছে নানা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে আর্থিক খাতের সংস্কার, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গণরায়, অর্থনৈতিক কৌশল এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে আগের সময়ের তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাতও বেড়েছে। যদিও এই অগ্রগতির হিসাব চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের।

২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আর স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। এতে তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির প্রতিটি বছরকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর মনে করেন, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের সংস্কার এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি খাতের সমস্যা কার্যকরভাবে সমাধান করা গেলে চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ হতে পারে। আর প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

অন্যদিকে, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের আগে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ডিউ ডিলিজেন্স আইন নিয়েও প্রয়োজনীয় স্পষ্টতা আনা দরকার।

তিনি আরও বলেন, আগামী তিন বছরে কোন সংস্কার কোন বছরে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এতে প্রস্তুতির সময়টুকু যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

অর্থ উপদেষ্টা আরও জানিয়েছেন, এলডিসি উত্তরণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিক অর্জনে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে পরিণত হয়—এটাই সরকারের লক্ষ্য। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যক্তি খাতের প্রতিনিধি এবং ছোট-বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মালিকানা ও ব্যক্তি খাতের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশলও রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই রূপান্তরে পরিণত করতে চায় সরকার। তার মতে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বড়।

এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্য দেশগুলোর জন্য এটি কোনো সাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হবে না। পাশাপাশি ২০২৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও অগ্রগতি নিয়ে মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘ। সেই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বাকি সময়ের করণীয় আরও স্পষ্ট হবে।

/এসআইএন

Logo