কমার্স ব্যাংকে আমানত সংগ্রহে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম
আমানত সংগ্রহে প্রণোদনার নামে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হামিদুর রহমান এবং ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এ অনিয়ম হয়েছে। এই ঘটনাটিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ট্রেজারি বিভাগের প্রধানকে বরখাস্তসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংকটে থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক আমানত সংগ্রহে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন ২০২৬’-এর আওতায় ২৭০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। গত ১৫ এপ্রিল মাসব্যাপী এ ক্যাম্পেইনের ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত আমানত না পাওয়ায় পরে এর মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ানো হয়। তবে এ সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
বর্ধিত সময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে ব্যাংকটি। এর বিপরীতে ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। ওই ১৩ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব থেকে দুই দিনে মোট ১৪টি চেকের মাধ্যমে পুরো ৪ কোটি টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়। সরেজমিনে প্রধান শাখার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।
ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৪ জুন বেলা পৌনে ১২টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ কোটি টাকা এনে ভল্টে রাখা হয়। ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে ৯টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে সেই টাকা ছয়টি বস্তায় ভরে এমডির পিএস হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরবর্তী কর্মদিবস ৭ জুন পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আরও ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। সেদিনও টাকা নিয়ে যান এমডির পিএস ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান। তবে আমানত সংগ্রহের বিপরীতে প্রণোদনার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অবগত ছিল বলে দাবি করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক বলেন, ১৩ জন কর্মী মিলে গ্রুপ করে এই আমানত সংগ্রহ করেছে। তাদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনা হিসেবে এই অর্থ দেওয়া হয়। বিষয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে জানানো হয়েছে। বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন বিষয়টি সমন্বয়ের চেষ্টা করছি।
প্রণোদনা পাওয়া ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন এমডির পিএস হামিদুর রহমান ও এফএভিপি সিদ্দিকুল্লাহ। প্রত্যেকে পেয়েছেন ৮০ লাখ টাকা। এছাড়াও তাসনুবা, আহসান হাবিব ও আদনান শফিক নিয়েছেন ৪০ লাখ টাকা করে।
তালিকায় আরও রয়েছেন সালেহ আহমেদ, সরোয়ার, সুজন দাস, দেলোয়ার, মনিরুল, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর ও শাহিনুর রহমান। অভিযোগ থাকলেও এ ঘটনায় তিনি নিজে কোনো সুবিধাভোগী নন বলে দাবি করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ওবায়দুল হক বলেন, পিএস হিসেবে নয়, তিনি মূলত মার্কেটিং বিভাগের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। কোনো ধরনের সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। একজন এমডি হিসেবে আমি এই সুবিধা নেবো কেন?
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রণোদনার নামে আমানতের অর্থ নেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই। কেউ অনৈতিক বা বেআইনি কাজ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা যদি আমানত সংগ্রহের নামে টাকা আত্মসাৎ করেন, তাহলে সেটি গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় তাকে ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।
তদন্ত প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। বলা হয়েছে, এর আগেও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ছিলেন তিনি। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হন দেলোয়ার। তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বরখাস্তের নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করেনি কমার্স ব্যাংক। নতুন করে আবারও তাকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক বলেন, এনআরবিসি ব্যাংক তাকে বরখাস্ত করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব পোর্টালে তার নাম প্রকাশ করা হয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়েছেন। প্রথমে নিম্ন আদালত এবং পরে হাইকোর্ট থেকেও তিনি এ আদেশ পান। তাই আদালতের আদেশ অমান্য করে কোনো ব্যবস্থা নিলে তা আদালত অবমাননার মধ্যে পড়তে পারে।
প্রণোদনার নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া অর্থ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, আমানত সংগ্রহ করা ব্যাংক কর্মীদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। এ কাজের জন্য আলাদা করে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু যারা এই অর্থ পেয়েছেন তাদের নয়, বরং যারা এই প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
এছাড়াও অনিয়মে জড়িত কোনো কর্মকর্তার ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
/এসআইএন