×
Logo

অর্থনীতি

সিএনএনের প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধে ‘সহজ টার্গেট’ হয়ে উঠছে এআই ডেটা সেন্টার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

ইরান যুদ্ধে ‘সহজ টার্গেট’ হয়ে উঠছে এআই ডেটা সেন্টার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নতুন এক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এআই ডেটা সেন্টারগুলো। সামরিক শক্তির মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিকে কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে ইরান। আর সেই কৌশলেই উন্মোচিত হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এআই ডেটা সেন্টারের বড় ধরনের দুর্বলতা।

ইরান এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের তেল শোধনাগার, তেল রফতানি অবকাঠামো এবং পর্যটনকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত দেশগুলোতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি।

এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ডেটা সেন্টার। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা মূলত এসব ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল।

ইরান ইতোমধ্যে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের ডেটা সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের একটি ডেটা সেন্টারে হামলা চালিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই সাইবার হামলার অন্যতম লক্ষ্য ডেটা সেন্টার। তবে সরাসরি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে এসব স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা নতুন মাত্রা পেয়েছে ২০২৬ সালে। এমন পরিস্থিতি সরকারের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এআইকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করে চলা প্রযুক্তি শিল্পের জন্যও এটি বড় সতর্কবার্তা।

যুদ্ধে 'নতুন ফ্রন্ট' ডেটা সেন্টার

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি ডেটা সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে অ্যামাজনের একটি ডেটা সেন্টার।

গত মাসের শেষদিকে, ওই স্থাপনায় দ্বিতীয়বারের মতো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এ বিষয়ে অ্যামাজন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে তাদের ক্লাউড সেবা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) ড্যাশবোর্ডে গত ৩০ এপ্রিল ডেটা সেন্টারে প্রথম হামলার পর থেকেই ওই অঞ্চলে সেবায় বিঘ্নের তথ্য দেখানো হচ্ছে।

স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতেও এডব্লিউএসের ওই স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।

যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই ইরান স্পষ্ট করে দেয়, তারা ডেটা সেন্টারগুলোকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এমন ২৯টি আঞ্চলিক প্রযুক্তি স্থাপনার একটি তালিকাও প্রকাশ করেছিল, যেগুলোতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল।

ওই তালিকায় অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়ার মালিকানাধীন স্থাপনাও ছিল।

গত ২১ জুলাই, অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে হামলার পর টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানি সরকার দাবি করে, মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে ক্লাউড সেবা সরবরাহ করে অ্যামাজন। এ কারণেই স্থাপনাটিতে ফের হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে অ্যামাজনের বেশ কয়েকটি চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের ‘জয়েন্ট ওয়ারফাইটিং ক্লাউড ক্যাপাবিলিটি’ প্রকল্পের একটি অংশ। গুগল, মাইক্রোসফট ও ওরাকলও এই প্রকল্পের অংশীদার।

এআইয়ের তৃতীয় বড় 'হাব' হতে চেয়েছিল উপসাগরীয় অঞ্চল

উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টারগুলো শুধু মার্কিন সামরিক বাহিনী ও এআই শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও নিজেদের এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি নিজেদের এআইয়ের তৃতীয় বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর।

সৌদি আরব তাদের ১ ট্রিলিয়ন ডলার এআই খাতে বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ করেছে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করে ‘স্টারগেট’ নামে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এটিই এ ধরনের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই প্রকল্পে অংশীদার হয়েছে ওপেনএআই, ওরাকল, এনভিডিয়া ও সিসকো।

বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত: এই ছয়টি দেশ সম্মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই-সংশ্লিষ্ট খাতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এর শর্ত হিসেবে চীনের সমপর্যায়ের প্রযুক্তি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বিষয়টিও রয়েছে।

ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও কৌশলগত বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছে। আর এরই সঙ্গে ওই অঞ্চলের এআই অবকাঠামো ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট।

তিনি বলেন, এসব হামলা এবং এ নিয়ে বিস্তৃত হুমকি এমন একটি অঞ্চলে বিনিয়োগ ও এআই উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে, যেটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে এসব হামলা যুদ্ধ ও কূটনীতিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা এবং তাদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, সেটিও সামনে নিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমানে, এআই বিপ্লবের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেকের কাছে এগুলো তুলনামূলক নতুন অবকাঠামো মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কয়েক দশক ধরেই ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং যুদ্ধের সময়ও এগুলো হামলার লক্ষ্য হয়েছে।

সামরিক বাহিনী সাধারণত সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে বসে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। শত্রুপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে জ্যামিংয়ের মতো কৌশল ব্যবহার করেছে। গত কয়েক দশকে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলাও।

তবে ডেটা সেন্টারে সরাসরি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা, এটি নতুন ধরনের ঘটনা।

এর পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এআই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ডেটা সেন্টারে তুলনামূলক কম খরচে, বিশেষ করে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালিয়েও ইরান বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ডেটা সেন্টারগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখানোর যুক্তিও ইরানের হাতে রয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির পাবলিক পলিসির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু রেড্ডি বলেন, ডেটা সেন্টারের গায়ে এমন কোনো চিহ্ন থাকে না যে সেখানে ‘সামরিক তথ্য’ সংরক্ষিত রয়েছে।

তার মতে, একই ডেটা সেন্টারে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকতে পারে, আবার বাণিজ্যিক কাজেও সেটি ব্যবহার করা হতে পারে।

রেড্ডি বলেন, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যামাজনের দিকে তাকালে সেটিকে যেন গায়ে আমেরিকান পতাকা আঁকা কোনো স্থাপনার মতোই মনে হতে পারে।

হামলা ঠেকাতে কতটা সক্ষম ডেটা সেন্টার?

এই পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়তে পারে ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী কোম্পানি এবং যেসব সরকার এসব স্থাপনা নিজেদের দেশে গড়ে তুলতে চাইছে, তাদের ওপর।

তবে বিমা প্রতিষ্ঠান এমএসআইজি ইউএসএর সম্পত্তি বিভাগের প্রধান ফিলিপ রে বলেন, ডেটা সেন্টার মূলত ভেতরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সরঞ্জাম রাখা বিশাল গুদামের মতো।

বোমা ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধের জন্য এসব স্থাপনাকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করা খুব কঠিন। তাই ডেটা সেন্টারগুলোতে শুরু থেকেই ‘রিডানড্যান্সি’ বা বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রের নিচে কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা প্রযুক্তিগত সমস্যার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই এই ব্যবস্থা রাখা হতো। এখন একই ব্যবস্থা সামরিক হামলার ক্ষেত্রেও কাজে আসছে।

অর্থাৎ একটি ডেটা সেন্টার অচল হয়ে গেলেও সেখানে থাকা তথ্য এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা সাধারণত অন্য কোনো ডেটা সেন্টার থেকে চালু রাখা সম্ভব।

হামলার ঝুঁকিতে বিনিয়োগে ভাটা?

যুদ্ধ চললেও উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে বিপুল অর্থ রয়েছে এবং এআই খাতে বিনিয়োগের আগ্রহও কমেনি। তবে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন এই অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের আগে বিষয়টি নিয়ে আরও সতর্কভাবে ভাবতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক অ্যান্ড্রু রেড্ডির মতে, কোনো কোম্পানি যদি মনে করে তাদের অবকাঠামো পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়, তাহলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ থেকে তারা পিছিয়ে যেতে পারে।

এরই মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিমা খরচও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিমা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিমা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মার্শের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রপার্টি ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিভাগের প্রধান জো ম্যাসেজাক বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন করে ভাবছে, তারা আদৌ এই অঞ্চলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা এগিয়ে নেবে কি না। একই সঙ্গে কিছু বিমা কোম্পানিও নির্দিষ্ট ঝুঁকি নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না।

তবে বিমা পাওয়া গেলেও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের সব ধরনের ঝুঁকি বিমা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না বলেও জানান তিনি।

এদিকে, এআইয়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিপ, নির্মাণসামগ্রী, শ্রমিকসহ ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রায় সব ধরনের খরচই বেড়ে যাচ্ছে।

ফলে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত একটি ডেটা সেন্টার যদি যুদ্ধের সময় সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে, তাহলে সেই ঝুঁকি বহন করা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

/এআই 

Logo